বাসস
  ২৩ মে ২০২৬, ১৪:২৫

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের ৮৯ শতাংশ অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার

প্রতীকী ছবি


ঢাকা, ২৩ মে, ২০২৬ (বাসস) : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, এমন নারীদের মধ্যে ৮৯ শতাংশ অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু-কিশোরী। ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার (টিএফজিবিভি) বেশি শিকার হচ্ছেন। এদের মধ্যে ১৮-৩০ বছর বয়সি নারীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। সামাজিক কুসংস্কারের ভয়ে টিএফজিবিভির শিকার নারীদের ৭৫ শতাংশই অভিযোগ করেন না। ২০২৪ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের গবেষণা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
 
বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) মতে, প্রযুক্তির বিস্তৃতি মানুষের সময় ও ব্যয় কমিয়েছে, নাগরিক সেবা সহজ করেছে। তবে প্রযুক্তির এ অগ্রগতির পাশাপাশি বেড়েছে অপব্যবহার। সংগঠনটি আরও জানায়, অনলাইনে ব্ল্যাকমেল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ইত্যাদির মাধ্যমে সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন অনেকেই। প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার কিছু ধরনের মধ্যে রয়েছে সাইবার স্টকিং, সাইবার বুলিং, ডক্সিং, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, ইমেজ বেজড অ্যাবিউজ, চাইল্ড গ্রুমিং, প্রযুক্তির সহায়তায় যৌন নির্যাতন, জেন্ডারভিত্তিক ঘৃণাসূচক মন্তব্য।
 
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মহাপরিচালক (প্রশাসন বিভাগ) মো. মেহেদী-উল-সহিদ বলেন, গত বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট অপসারণের জন্য ১৩ হাজার ২৩টি আবেদন পেয়েছে বিটিআরসি। ১২ হাজারের বেশি কনটেন্ট অপসারণ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ছিলেন নারী। নারীদের হয়রানির বিরুদ্ধে পরিবার থেকে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
 
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের তথ্য মতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের কাছে সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী প্রতিকার চেয়েছেন। সাইবার স্পেসে ভুক্তভোগী এসব নারীর ৪১ ভাগই ডক্সিংয়ের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৮ ভাগ ফেসবুক আইডি হ্যাক, ১৭ ভাগ ব্ল্যাকমেইলিং, ৯ ভাগ ইমপার্সোনেশন, ৮ ভাগ সাইবার বুলিংজনিত সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করেছেন।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশে কয়েকটি আইন রয়েছে। এসব আইন সম্পর্কে জানাতে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচার ও প্রতিকার প্রাপ্তিকে আরও কার্যকর করা, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও সেবাদাতা সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ব্যক্তি, পরিবার ও এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট কমাতে জাতীয় পরিচয়পত্র যুক্ত করা ও কান্ট্রি স্পেসিফিক সার্ভিস (কোনো দেশের জন্য সুনির্দিষ্ট সেবা) নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
 
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে নারীদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
 
আইনি সহায়তা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদা ইয়াসমিন বলেন, প্রতিটি জেলা আদালতে আইনি সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে। এসব জায়গায় গিয়ে ও হটলাইন নম্বর ১৬৬৯৯-এ কল করে ধনীু-দরিদ্র যে কেউ আইনি সহায়তা ও পরামর্শ নিতে পারেন। কেউ আইনি সহায়তা না নিলে পুলিশের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই আইনি সহায়তা চাওয়ার বিষয়েও সচেতনতা দরকার।
 
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক খলিলুর রহমান খান প্রযুক্তি সহায়ক জেন্ডারভিত্তিক প্রকল্প দ্রুত পাস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি, অনলাইন ব্যবহার করে কী ধরনের সহিংসতা ও প্রতারণার ঘটনা ঘটতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
 
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন আহমেদ বলেন, অনলাইনে সবচেয়ে বেশি ডক্সিংয়ের (বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদি অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে হুমকি দেওয়া) শিকার হন নারীরা। এ হার ৪৮ শতাংশ। পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০০০৮৮৮, ফেসবুক পেজ Police Cyber Support for Women-PCSW  ই-মেইল [email protected] ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার নারীরা অভিযোগ জানাতে পারেন বলেও জানান তিনি।
 
বাংলাদেশ উইমেন ইন আইটির সাবেক পরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, অনলাইনে সহিংসতার শিকার হওয়ার পর একজন নারী মানসিকভাবে যে আঘাতপ্রাপ্ত হন, তা সহজে সারে না। টিএফজিবিভির শিকার নারীরা যেন আইনি সহায়তা নেন, সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় লুকিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নারীদের হয়রানি করা হয়। ভুয়া অ্যাকাউন্ট ঠেকাতে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র যুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মেটার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশকে উপাত্ত সুরক্ষা আইনের ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের কাছ থেকে কান্ট্রি স্পেসিফিক সার্ভিস নেওয়ার ব্যবস্থা নেয়া গেলে, ভুয়া আইডি বা অ্যাকাউন্ট তৈরি বন্ধ হবে বলেও মনে করেন কানিজ ফাতেমা।
 
বেসরকারি সংস্থা বিএনএনআরসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য বিদ্যমান সরকারি সহায়তা সেবাসমূহ সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানো জরুরি। পরিবার থেকেই অনেক সময় সহিংসতার শিকার ব্যক্তির প্রথম বাধা আসে, তাই পরিবার ও সমাজকে সচেতন করতে গণমাধ্যমেরও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এ সময়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার নতুন ও জটিল রূপগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা, আলোচনা এবং প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করতে হবে। প্রতিরোধ, সুরক্ষা, দ্রুত প্রতিকার ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।