শিরোনাম

ঢাকা, ১৮ মে, ২০২৬ (বাসস): ডিজিটাল সেন্টার একটি সফলতার নাম, যার ওপর ভিত্তি করে ক্রমশ বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল। নাগরিকের তথ্য প্রাপ্তি ও তাদের সকল সমস্যার সমাধান এখন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠা এসব ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে। এতে প্রান্তিক মানুষের হাতের মুঠোয় সহজ ও ঝামেলাহীনভাবে পৌঁছে যাচ্ছে সকল সরকারি-বেসরকারি সেবা, যা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে রাখছে ব্যাপক ভূমিকা। ফলে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
গ্রামীণ জীবনেও আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি ইউনিয়নে চালু করা হয়েছে ডিজিটাল সেন্টার। এই আমূল পরিবর্তনের সারথী হয়ে দেশের নাগরিকদের নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের নারী উদ্যোক্তারা। যারা সংখ্যায় দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক। তারাও যে একটু সুযোগ পেলে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠতে পারে তার অন্যতম উদাহরণ ডিজিটাল সেন্টারগুলো।
বর্তমানে সারাদেশের ৮ হাজারের অধিক ডিজিটাল সেন্টারগুলোয় প্রায় ১৬ হাজারের অধিক উদ্যোক্তা কাজ করছেন, যার অর্ধেকই রয়েছেন নারী উদ্যোক্তা। এসব ডিজিটাল সেন্টার থেকে ৩৬০-এর অধিক সরকারি-বেসরকারি সেবা খুব সহজে, দ্রুত ও স্বল্প খরচে গ্রহণ করতে পারছেন নাগরিকরা। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিমাসে ডিজিটাল সেন্টার থেকে গড়ে ৭০ লাখের বেশি সেবা প্রদান করা হচ্ছে। অর্থাৎ, এপর্যন্ত উদ্যোক্তারা ৮০ কোটির অধিক সেবা প্রদান করেছেন। যার ফলে নাগরিকদের প্রায় ১.৬৮ বিলিয়ন সমপরিমাণ কর্মঘন্টা ও ৭৬৭.৭৫ বিলিয়ন অর্থ ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নারী উদ্যোক্তারা ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন। নাগরিকদের সেবা প্রদান, তাদের জীবনমান উন্নয়ন করার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে এ সকল নারী উদ্যোক্তারা। সেইসাথে তারা প্রান্তিক অঞ্চলে নতুন নতুন উদ্যোক্তাও সৃষ্টি করছেন। মাত্র এক যুগ আগেও যেখানে গ্রামের মানুষের ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে ধারণা ছিল না, সেখানে ডিজিটাল সেন্টারের নারী উদ্যোক্তারা তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়নের মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছেন, সেবা গ্রহণের জন্য আগ্রহী করেছেন। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে অল্প সময়ে এবং নামমাত্র মূল্যে অনেক সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
খুলনার বয়রা অঞ্চলের রেহনুমা তাবাসসুমের স্বামী একজন প্রবাসী শ্রমিক। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিনি রেমিটেন্স পাঠান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বয়রায় কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল না। ফলে রেহনুমাকে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করার জন্য ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলায় যেতে হতো। এতে করে তাকে গুনতে হতো নগদ টাকা এবং দিনের অর্ধেকটা সময়। বিগত সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চল থেকে এমনই হাজারো রেহনুমার গল্প চলে আসছিলো ।
তবে ডিজিটালাইজেশন হওয়ার পর বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে নাগরিকের ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্তি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই অর্জন এত দ্রুত পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এই অর্জন বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা রেখে চলেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা ডিজিটাল সেন্টারগুলো। ফিন-টেক-এর মতো আর্থিক পরিষেবার ডিজিটাল সেন্টারগুলোয় অন্তর্ভুক্তি নাগরিকের হয়রানি হ্রাস করছে, তাদের সেবা প্রাপ্তিকে করেছে আরও ত্বরান্বিত, আরও সহজ। মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস)-এর মতো পরিষেবামূলক ব্যবস্থার ফলে ব্যাংকিং সেবা এখন পৌঁছে যাচ্ছে নাগরিকের দোরগোড়ায়। সামগ্রিকভাবে এই ডিজিটালাইজেশন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য রাখছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব।
যেমন, সাভার ভাকুর্তা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের এজেন্ট ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র একজন এজেন্টের হাতেই ৩ হাজার নাগরিককে সরাসরি ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এই কাজের মাধ্যমে সেই উদ্যোক্তা যেমন তার নিজের উপার্জন কয়েক গুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন তেমনি পরিধি বেড়েছে নাগরিকের ব্যাংকিং পরিষেবার। এই সকল সফলতার গল্প আজকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দৃশ্যমান।
শুরু থেকে সেবাগুলো জনগণের নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য একটি মডেলে কাজ করেছে। বটম-আপ পদ্ধতির এই মডেলের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণকে সংযুক্ত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় সেবা প্রদান ব্যবস্থার সাথে। ফলে সহজ ও স্বচ্ছতার সাথে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত সেবাসমূহ। শুধুমাত্র ডিজিটাল সেন্টার বাস্তবায়ন হওয়ার ফলেই সুবিধাভোগীর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন সেই সকল জনগণ, যারা পূর্বে একঅর্থে মৌলিক পরিষেবার বাইরেই থেকে গিয়েছিলেন। বর্তমানে ডিজিটাল সেন্টার শহর ও গ্রামের নাগরিকদের জীবনমান বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। যেখান থেকে ৩৬০-এর অধিক সরকারি-বেসরকারি পরিষেবা খুব সহজেই গ্রহণ করতে পারছেন নাগরিকরা।
সেবা প্রাপ্তিতে এই সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংগঠিত হয়েছে এক নীরব বিপ্লব; যেটা দেশের সকল নাগরিকের কাছে আজ দৃশ্যমান। এসব ডিজিটাল সেন্টার থেকেই একজন উদ্যোক্তা সেবা প্রদানের মাধ্যমে মাসে আয় করতে পারছেন ৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। যেটা মফস্বল জীবনে বয়ে আনছে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য।
হবিগঞ্জ স্নানঘাট ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা তাহেরা আক্তার শিরিন। উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করার পর প্রথম দিকে নারী হওয়ার কারণে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। একদিকে সংসার, অন্যদিকে নিজের স্বপ্ন। কিন্তু তাহেরা পিছু হটেননি। নিজের প্রচেষ্টায় এগিয়ে গেছেন বহুদূর। মাত্র একটি ডেস্কটপ দিয়ে শুরু করা তার ডিজিটাল সেন্টারে এখন রয়েছে পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত উপকরণ এবং লক্ষাধিক টাকার আসবাবপত্র।
অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিতের পাশাপাশি ডিজিটাল সেন্টারগুলো নারীদের আত্মসম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাতেও রাখছে সহায়ক ভূমিকা।
উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলার মুকুন্দপুর ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা মোছা. নূরে জান্নাতুন নেছা কাজ করছেন প্রায় এক দশক ধরে। এখন সেবা প্রদানের মাধ্যমে তার ইউনিয়নের প্রতিটি মানুষের সাথেই তৈরি হয়েছে সখ্যতা। তার মতে, এ যেনো একটা পরিবার। প্রতিদিনই গ্রামের মানুষেরা বিভিন্ন রকম সমস্যা নিয়ে আসে, সেটার সমাধান পেলে হাসি মুখে বিদায় নেয়। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে এটা অনেক বড় পাওয়া।
কক্সবাজারের কাকারা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা সাদিয়া কাউসার খানম ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন নিজে কিছু করার। কিন্তু পারিবারিক অবস্থান বা সামাজিক পরিবেশ তার এই স্বপ্নের অনুকূলে ছিল না। এছাড়া গ্রামে বসে উদ্যোক্তা হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও ছিল না। সাদিয়া খানমের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছে ডিজিটাল সেন্টার। এখন সাদিয়া খানম নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি কাজ করছেন নিজ ইউনিয়নের শিক্ষিত বেকারদের জন্য। আয়োজন করছেন নানা প্রশিক্ষণের।
দেশজুড়ে সেবা প্রদানের মাধ্যমে এ সকল নারী উদ্যোক্তারা নিজেদের পরিবর্তনের যে বৈপ্লবিক অগ্রযাত্রা শুরু করেছে, তার ফলাফল বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুদূর ভবিষ্যতে তাদের এ অগ্রযাত্রা দেশের নারীদের এগিয়ে নেবে বহুদূর। বর্তমানে ডিজিটাল সেন্টারে একজন উদ্যোক্তার হাত ধরে ইউনিয়ন পর্যায়ে সৃষ্টি হচ্ছে হাজার হাজার উদ্যোক্তা। পারিবারিক বা সামাজিক সংকট মোকাবেলা করে যারা নিজ নিজ স্বপ্ন পূরণে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এভাবেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছে আমাদের নারীরা। যার যার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অদম্য গতিতে। নারীর এই এগিয়ে যাওয়া দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির এক অপ্রতিরোধ্য যাত্রা। তাদের অগ্রযাত্রার ফলেই নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী, করোনা মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়েও তারা ছিলেন সম্মুখ সারির যোদ্ধা। যে তৈরি পোশাক আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সেই খাতেও ৮০ শতাংশের বেশি নারী কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত এ সকল নারীর প্রতিটি বুননে ফুটে উঠেছে আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের অবয়ব; এবং নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই অংশগ্রহণমূলক ধারাবাহিকতায় রচিত হবে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।