বাসস
  ১৪ মে ২০২৬, ০৯:২৫

ডাউন সিনড্রোম শিশুদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসকে সঠিকভাবে লালন করলে তারা সমাজে মূল্যবান অবদান রাখতে পারে

প্রতীকী ছবি

ঢাকা, ১৪ মে, ২০২৬(বাসস) :  এগারো বছরের নাফিজ ইসলাম নাচ-গান খুব ভালোবাসে। নতুন কাউকে দেখলে তার সাথে দ্রুত বন্ধুত্ব করতে চায়। আর বেড়াতেও খুব পছন্দ করে। বাবা অফিস থেকে বাসায় ফিরলেই বাইরে যেতে চায় বাবার সাথে।

তবে তার যে ক্লাসে পড়ার কথা সে সেই ক্লাসে না পড়লেও তার অক্ষর জ্ঞান আছে। বাংলা এবং ইংরেজিতে এক থেকে পঞ্চাশ পর্যন্ত গণনা করতে শিখেছে। আবার বেশ কয়েকটি ছড়াও মুখস্থ বলতে পারে। তাই তার মা রাহেলা আর বাবা রাতুল খুব খুশি। কারণ তাদের সন্তান একজন ডাউন সিনড্রোম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু। এ ধরনের শিশুরা সব কিছুতেই পিছিয়ে থাকে। তাদের বিকাশ বিলম্ব হয়।

ডাউন সিনড্রোম হলো ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের অতিরিক্ত প্রতিলিপি বা ট্রাইসোমির কারণে সৃষ্ট একটি জন্মগত জেনেটিক অবস্থা। এই অবস্থায় শারীরিক বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়, যার ফলে আক্রান্ত শিশুদের চেহারা ও বৃদ্ধিতে বিশেষ লক্ষণ দেখা দেয়। বিশ্বজুড়ে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে একটি শিশু এই সিনড্রোম নিয়ে জন্মায়। এদের বিকাশ খুব ধীর গতিতে হয়। একজন ২৭ বছর বয়সি ব্যক্তির বৃদ্ধি আট থেকে দশ বছরের শিশুর মতো।

গত ৮ এপ্রিল সরকারিভাবে পালিত হয়েছে ১৩তম জাতীয় ও ২১তম বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস ২০২৬। যদিও দিবসটি প্রতি বছর ২১ মার্চ পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘একসাথে পথ চলি, নিঃসঙ্গতা দূর করি’।

রাহেলা বলেন, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে আমার ছেলের উন্নতির জন্য সারাক্ষণ কাজ করি। উপরওয়ালা হয়তো আমাদের যোগ্য মনে করেছেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের শিশুর সাথে অন্য শিশুদের মতো ব্যবহার করলে হবে না। কারণ তারা অনেক কিছুই বুঝতে পারে না। তাই অনেক ধৈর্য নিয়ে তাদের সাথে চলতে হয়।
 
দশ বছর বয়সী মহুয়ার নাচ দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না ডাউন সিনড্রোম নামের কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে তার। শিক্ষক নুরুন নাহারের সঙ্গে মহুয়ার নাচ দেখে সবাইকে মনে করতে বাধ্য করবে, কোনো সুস্থ শিশুর চেয়ে কম ভালো নাচেনি সে।
 
শিক্ষক নাহার জানান পড়াশোনার চেয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও খেলাধুলায় বেশি পারদর্শী হয় ডাউন সিনড্রোমের শিশুরা।

তিনি বলেন, ‘ডাউন সিনড্রোম বাচ্চাদের নাচতে বলতে হয় না। মিউজিক ছেড়ে দিলে ওরা নিজেরাই উঠে নাচতে থাকে। ওদের শেখাতে খুব কষ্টও হয় না। ওদের পেছনে লেগে থাকলে এই শিশুরা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে শিল্পীও হতে পারে।

একই কথা বলেন ভোকেশনাল প্রশিক্ষক মাসুদা খানম। মাসুদা বলেন, তার স্কুলে এখন ১০ জন ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তি আছে। তাদের মধ্যে একজন আবুল কালাম আজাদ (২৭)। মাকে নিয়ে তিনি ঢাকায় থাকেন। ভোকেশনাল স্কুলে সহকারী হিসেবে চাকরি করেন।

দেখিয়ে দিলে কাজ ঠিক করে কিন্তু অন্য কোথাও তার চাকরি হয় না। পরিবারগুলো এদের সামনে আনতে চায় না। অনেক পরিবার সামনে এলেও তাদের সুযোগ-সুবিধার অভাবে তারাও হতাশাগ্রস্ত হয়।

নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের তথ্য মতে, দেশে ৪ ধরনের স্নায়ু বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৪ লাখ ৫২ হাজার। এদের মধ্যে ডাউন সিনড্রোম শনাক্ত হয়েছে সবচেয়ে কম। এ পর্যন্ত দেশে ৮ হাজার ৩০ জন ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। যদিও বেশির ভাগই শনাক্তের বাইরে বলে জানান এনডিডি ট্রাস্ট-এর সহকারী পরিচালক মো. আবু তৈয়ব খান।

তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটি চলমান। সরকারিভাবে দেশে অভিভাবকদের সচেতন করা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের শনাক্ত হলে তাদের কীভাবে লালনপালন করা হবে তাও প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং দেওয়া হয়। তবে প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।
 
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিশুদের বিশেষ করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নে কাজ করছে।