শিরোনাম

ঢাকা, ৮ মে, ২০২৬ (বাসস): শিক্ষা সফরে কক্সবাজার গিয়েছিলেন এক ছাত্রী। যানজটের কারণে ঢাকায় ফিরতে মধ্যরাত। ‘সান্ধ্য আইনের’ দোহাই দিয়ে কিছুতেই ফটক খোলেননি মেসের ব্যবস্থাপক। ঢাকায় আত্মীয়স্বজন না থাকায় মেয়েটি রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে বাড়ির এক ভাড়াটের হস্তক্ষেপে মেসে ঢুকতে পারে।
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বদরুন্নেছা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্রী। তিনি বলেন, ‘কী করব, কোথায় যাব, সেদিন রাতে কিছু ভাবতে পারছিলাম না। এ কষ্ট কেবল সে-ই অনুভব করতে পারে, যার ঢাকায় কোনো বাসা কিংবা থাকার জায়গা নেই।’ এ পর্যন্ত তাকে তিনবার জায়গা বদল করতে হয়েছে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের একজন নারী কর্মকর্তা পূর্ব রাজাবাজারের একটি বেসরকারি হোস্টেলে ‘সিংগেল রুম’ বা এক কক্ষে থাকেন। রান্না ঘরের খুপড়িতে দরজা লাগিয়ে রুমটি বানানো হয়েছে। থাকা-খাওয়া বাবদ মাসিক খরচ ১৫ হাজার টাকা। সরকারি, বেসরকারি হোস্টেল নিবাসী ছাত্রীরা বলেছেন, বেশিরভাগ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার হোস্টেল নেই। অন্যের বাড়িতে সাবলেট নিয়ে থাকাটা নিরাপদ নয়। ফলে মেসে বা বেসরকারি হোস্টেলে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
এক ছাত্রীর ভাষায় ‘এসব হোস্টেল বেশি আয় এবং নীরব নির্যাতনের একটি চলমান ব্যবস্থা।’ অন্যদিকে কর্মজীবী নারী একা বাসা ভাড়া পান না। বেসরকারি হোস্টেল বা সাবলেটই ভরসা। রাতে ডিউটি থাকলে ভোগান্তির এক শেষ। চাকরি ছাড়ার নজিরও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক অনিমা হক বলেন, দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মেয়েরা ঢাকায় পড়তে আসছেন, চাকরিতে ঢুকছেন। আবাসন তাদের অনেকের জন্যই একটা বড় সমস্যা। আবাসনের অভাবে তারা যাতে না পড়েন, সে ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে। পাশাপাশি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকায় স্বল্প কয়েকটি কর্মজীবী নারী হোস্টেল আছে। চারটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে এক হাজারের কিছু বেশি আসন আছে। হোস্টেল মালিকদের একটি সমিতির একজন কর্মকর্তার ধারণা, ঢাকায় প্রায় এক হাজার বেসরকারি হোস্টেল আছে। সিংহভাগই নারীদের জন্য। সরকারি হোস্টেলে থাকা-খাওয়া মিলিয়ে খরচ খুব বেশি হয় না। তবে বেসরকারিগুলোতে খরচ কয়েকগুণ বেশি। আবার কোনো হোস্টেলেই সন্তানসহ থাকা যায় না।
বকশিবাজারে বদরুন্নেসা কলেজের কাছাকাছি খাবার আর বসার ঘরসহ পাঁচ রুমের একটি বাসা। এতে থাকেন ২০ জন মেয়ে। জনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া। খাবার ভরচ আলাদা। হলে সিট না পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী এখানে থাকছেন। তিনি বলেন, খাবারের মান ভালো নয়। প্লেটে ভাত দেওয়ার সময় ম্যানেজার দাঁড়িয়ে থাকেন। ফিরতে হয় রাত দশটার মধ্যে। কিছু বলতে গেলেই বাসা ছাড়ার হুমকি দেয়।
আশ্রয় হারানোর ভয়ে সব কিছু মেনে নেন বলে জানান ছাত্রীটি। কলেজের হোস্টেলে সিট পেতে চাইলে খরচপাতি আছে। আবার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। বাধ্যতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে হবে। তাই অগতির গতি, এই মেস।
সব মিলিয়ে বেসরকারি ছাত্রী হোস্টেলের পরিবেশ, খাবারের মান নিয়ে মেয়েরা অসন্তুষ্ট। ফার্মগেট, ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, সিদ্ধেশ্বরীসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি উদ্যক্তারা যে যার মতো হোস্টেল খুলে চালাচ্ছেন। সরকারের কোনো নীতিমালা, আইন বা নজরদারি নেই।
সংগঠনের নাম হোস্টেল মালিক সমিতি : সদস্য ৪১ জন। নাম প্রকাশ না করে এক সহ-সভাপতি বলেন,‘ মালিকেরা বাসিন্দার নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তবে খাবারের মান ও পরিবেশের দিকেও নজর থাকে। তারপরও কিছু হোস্টেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।’
পূর্ব রাজাবাজারের একটি বেসরকারি হোস্টেলের ছোট ছোট ঘরে তিন-চারজন গাদাগাদি করে থাকছেন।
প্রত্যেকে একটা কাঠের ছোট চৌকি আর একটা টেবিল ফ্যানের জায়গা পান। কাপড়-চোপর, ব্যাগ সব রাখতে হয় চৌকির নিচে। বিছানার ওপর দড়ি টাঙিয়ে ভেজা কাপড় মেলতে হয়।
এখানকার বাসিন্দা এক ছাত্রী বলেন,‘ তেলাপিয়া, নলা(ছোট রুই) ও পাঙ্গাশের বাইরে কোনো মাছ থাকে না।
ক’দিন পর মুখে তোলা যায় না। আর এক বেলা পরপরই ডিম।’
জনশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের শহরাঞ্চলে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ৬০ লাখের কিছু বেশি। বড় অংশটি কাজ করেন ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজধানীতে কর্মজীবী নারীদের জন্য নীলক্ষেত, মিরপুর, খিলগাও আর বেইলি রোডে চারটি হোস্টেল আছে। এগুলোতে মাত্র ১ হাজার ৮৬জন নারী থাকতে পারেন।
এর মধ্যে আসনসংখ্যা বেশি রয়েছে নীলক্ষেতে। হোস্টেলটির তত্ত্বাবধায়ক জানান, মাসে চার-পাঁচটি আসন খালি হয়। আর আবেদন পত্র জমা হয় শতাধিক। এখনো কয়েকশ আবেদন পড়ে আছে। বেশ কয়েকজন নারী বলেছেন, আসন পেতে উচ্চ পর্যায়ের তদবির লাগে।
স্বামী চট্টগ্রামে বদলি হওয়ায় ঢাকায় এনজিও কর্মকর্তা স্ত্রী একা থাকতে কষ্ট পেতেন। নীলক্ষেত হোস্টেলে থাকতে আবেদন করেছিলেন। না পেয়ে কয়েকমাস পর তিনি চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। নাম প্রকাশ না করে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন বলেন, চাহিদার তুলনায় ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। মিরপুর ও নীলক্ষেত হোস্টেলটি বড় করার কাজ চলছে। যথাক্রমে ২৪৫ ও ৩৬৮টি আসন বাড়ব।
সরকারি হোস্টেলে আসন পেতে অবিবাহিত, বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে(কিছু ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য), বোর্ডারকে অন্তত স্নাতক এবং ১৮-৫৯ বছর বয়সি হতে হবে।
এখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। তবে খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ আছে। বাথরুমের অবস্থাও ভালো নয়। সন্তানসহ থাকার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের(বিআইডিএস)জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে অনেক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য সরকারকে হোস্টেল বাড়াতে হবে। বেসরকারি খাতকেও এক রুমের ফ্ল্যাট বানানোর প্রকল্প নিতে হবে। প্রয়োজনে সরকার এসব প্রকল্পে ভর্তুকি দেবে।