শিরোনাম

জেনেভা, ৫ মে, ২০২৬ (বাসস) : শিক্ষাকে জীবনব্যাপী একটি নীতি-কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক জীবনব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে চলমান ডিজিটাল, সবুজ ও জনমিতিক পরিবর্তন দেশগুলোর ভেতরে এবং এক দেশের সাথে আরেক দেশের বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নতুন এক প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করেছে।
‘ভবিষ্যতের জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষা এবং দক্ষতা’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়, আধুনিকায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সবুজ রূপান্তর এবং জনমিতিক পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
কর্মী জরিপ, অনলাইন চাকরির চাহিদা বিশ্লেষণ, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এবং প্রশিক্ষণ কার্যকারিতা নিয়ে ১৭৪টি গবেষণার পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
আইএলও’র মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ. হংবো বলেন, ‘জীবনব্যাপী শিক্ষা বর্তমানের কাজ ও ভবিষ্যতের সুযোগের মধ্যে সেতুবন্ধন। এটি শুধু কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার বিষয় নয়; বরং শোভন কাজ নিশ্চিত করা, উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়া এবং যা স্থিতিশীল সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এটি টেকসই উন্নয়ন কৌশলের একটি অপরিহার্য উপাদান।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ গত এক বছরে কোনো কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে স্থায়ী পদে নিযুক্ত পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত এই ধরনের প্রশিক্ষণের হার ৫১ শতাংশ। এই ব্যবধানটি শেখার সুযোগে স্পষ্ট বৈষম্য তুলে ধরে, বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের মধ্যে এবং বিভিন্ন শিক্ষাস্তরের ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশে আইএলও’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, ‘প্রতিবেদনের বৈশ্বিক প্রবণতাগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিয়োগদাতারা এখন প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ‘সফট স্কিল’ সম্পন্ন কর্মী খোঁজেন। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা জরুরি, যাতে পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়।’
অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপনের আইএলও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, দলগত কাজ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার চাহিদা অনেক বেশি।
আইএলওর হিসাবে, বিশ্বে প্রায় ৩২ শতাংশ কর্মী পরিবেশ সম্পর্কিত কাজে যুক্ত। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সবুজ রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত সব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শোভন কাজ নয়। সঠিক দক্ষতা ও নীতির সমন্বয় না থাকলে এসব নতুন সুযোগ উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত নাও করতে পারে।
বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি সেবা খাতে কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে - ২০২৩ সালে যেখানে সাড়ে ৮কোটি ছিল, তা ২০৫০ সালে ১৫.৮ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই খাতের অনেক বেতনভুক্ত কর্মী এখনো কম মজুরি ও অনুপযুক্ত কর্মপরিবেশে কাজ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনব্যাপী শিক্ষাকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মক্ষেত্র ও সামাজিকভাবে প্রসারিত করতে হবে। জীবনব্যাপী শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার সক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতা নয়; বরং এটি শোভন কাজ, উদ্ভাবন, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি।
তবে অনেক দেশেই শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো খণ্ডিত এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ভুগছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ৩৪ শতাংশ দেশ প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষায় শিক্ষা বাজেটের ১ শতাংশের কম ব্যয় করে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার ৬৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনে সরকার, নিয়োগদাতা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শেখার সুযোগ সম্প্রসারণ, শক্তিশালী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং মানুষের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসাথে প্রতিবেদনটি সুশাসন, সমন্বয়, অর্থায়ন এবং সামাজিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনের সতর্কবার্তা - দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের কর্মজগতের এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে পিছিয়ে ফেলতে পারে।