শিরোনাম

ঢাকা, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। স্বপ্ন ছাড়া মানুষের জীবন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সবার স্বপ্ন পূরণ হয় না। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য স্বপ্ন দেখা অনেক সময় বিলাসিতার মতো মনে হয়। এমন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার এক স্কুলছাত্রী মোমেনা (ছদ্মনাম)।
মোমেনা তার স্কুলের খাতায় লিখে রেখেছিল: শিশুরা যখন স্বপ্ন দেখতে শেখে, তখনই অনেক মেয়েশিশুকে সেই স্বপ্ন ফেলে শ্বশুরবাড়ির পথে পা বাড়াতে হয়। শুধু শিশুই নয়, অনেক কিশোরী ও তরুণীকেও শৈশবের লালিত স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়। কেউ কেউ নতুন পরিবেশে নতুন স্বপ্ন গড়ে তুললেও, পুরোনো স্বপ্নের শূন্যতা থেকে যায়।
মোমেনা বাঘা উপজেলার নওটিকা আরিপপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। সেখান থেকে পাস করে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বিয়ে হয়ে যায়। পরে তার ছোট ভাই সেই বিদ্যালয়ে পড়তে এসে তার খাতাটি নিয়ে আসে। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষিকা দুলারি খাতুন খাতাটি পেয়ে তা প্রধান শিক্ষককে দেখান।
প্রধান শিক্ষক কবিরুজ্জামান বলেন, ‘মেয়েটি এত বড় স্বপ্ন দেখতে পারে- এটা প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যম মানের ছাত্রী হয়েও সে এত গভীর চিন্তা করেছে- এটি বিস্ময়কর। হয়তো শিশুদের মনোজগত সম্পর্কে আমাদের ধারণাই যথেষ্ট নয়।’
দুলারি খাতুন বলেন, গ্রামের অধিকাংশ মেয়েই বাল্যবিবাহের শিকার হয়। বিয়ের ব্যাপারে খুব কম মেয়েই আপত্তি করে। ওই মেয়েটি আপত্তি করেছিল কি না জানা যায়নি। তবে তার খাতায় লেখা ভাবনাগুলো ছিল গভীর ও প্রশ্নজাগানিয়া। তাই তিনি খাতাটি সংরক্ষণ করেন- একটি নীরব প্রতিবাদের নিদর্শন হিসেবে।
বর্তমানে মোমেনার বিয়ে একই জেলার চারঘাট উপজেলায়। তার দুই ছেলে। বড় ছেলের বয়স ৯ বছর। সন্তানদের নিয়েই এখন তার সব স্বপ্ন। তাদের পড়াশোনার জন্য প্রাইভেট শিক্ষক রেখেছেন, নিজেও দেখাশোনা করেন। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গেও তার সম্পর্ক ভালো। তিনি জানান, গত ১০ বছরে নিজের পুরোনো স্বপ্নগুলো অনেকটাই ভুলে গেছেন।
তবে সব গল্প এক নয়। অনেক তরুণী আছেন, যারা শ্বশুরবাড়িতে ভালো থাকলেও শৈশবের অপূর্ণ স্বপ্ন তাদের মনে দাগ কেটে থাকে।
বরিশাল সদর উপজেলার হেলেনার স্বপ্ন ছিল ব্যারিস্টারি পড়ার। অভিনয় ও নাচ শেখার ইচ্ছাও ছিল। পারিবারিক অবস্থাও অনুকূল ছিল। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরপরই বিয়ের প্রস্তাব আসে এবং বিয়ে হয়ে যায়। পরের বছরই সন্তানের জন্ম হয়। এরপর পড়াশোনা গৌণ হয়ে পড়ে। যদিও তিনি থেমে থাকেননি- রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। এখন তার পাঁচ বছর বয়সি মেয়েকে ঘিরেই নতুন স্বপ্ন।
খুলনার রোকসানার গল্প ভিন্ন। ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেও আর্থিক সংকটে কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। পরে পরিবারের চাপে বিয়ে হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নিয়ে স্বাবলম্বী হব। কিন্তু পারিনি। এখন আমার মেয়েকে নিয়েই সেই স্বপ্ন দেখি—ও যেন আমার মতো পরিস্থিতির শিকার না হয়।’
এই গল্পগুলো প্রমাণ করে, বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি স্বপ্নভঙ্গের গল্পও। প্রতিটি অসময়ে থেমে যাওয়া স্বপ্নের পেছনে লুকিয়ে থাকে একেকটি সম্ভাবনার মৃত্যু।