বাসস
  ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:২২

জ্বালানি সংরক্ষণে সক্ষমতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

ঢাকা, ৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংরক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা।

আজ রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবেলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত গোল টেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, জ্বালানির ঘাটতি দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তা আরও তীব্র হয়েছে। তিনি জানান, গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হলে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং বিদ্যুৎ চালিত যানবাহন নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন শিল্প সচিব।
সচিব জানান, বিদ্যুৎচালিত যানবাহন বিষয়ক একটি নীতি সম্পন্নের শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা শিগগিরই  চূড়ান্ত করা হবে।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণে দেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে চাপের মুখে রয়েছে। তিনি জানান, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানির মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং তা দ্রুত আমদানি করা না গেলে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরও জানান, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এবং দাম ১২০ ডলার ছাড়ালে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪-৫ বিলিয়ন ডলারে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাবে শিল্পখাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে, সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং কন্টেইনার পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় গুণতে হচ্ছে।

দেশের সকল স্তরের দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অফশোর ও অনশোরে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান শুল্কহার হ্রাস, এ খাতের উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদানসহ সর্বোপরি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দীর্ঘসূত্রিতা কমানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার একান্ত অপরিহার্য বলে অভিমত জ্ঞাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান বলেন, জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এ সংকট মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর কৌশল প্রণয়ন জরুরি। তিনি জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান।

বিইআরসি সদস্য (বিদ্যুৎ) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনাময় হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অফশোর ও অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সৌর বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শুল্ক হ্রাস, স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়–য়া বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মাধ্যমে ভর্তুকি কমানো প্রয়োজন। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নীতিগত সহায়তার কথা উল্লেখ করেন।

বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। তিনি এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

ইডকলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের পাশাপাশি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

এছাড়া আলোচনায় বিজিএমইএ, পিডিবি, বুয়েটসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং জ্বালানি খাতে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সভায় ডিসিসিআই’র ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।