শিরোনাম

জীতেন বড়ুয়া
খাগড়াছড়ি, ২৩ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): ঈদ-উল ফিতরের টানা ছুটিতে খাগড়াছড়িতে এবার রেকর্ড পরিমাণ পর্যটক এসেছে। প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্য ও ঝর্ণার শীতলতায় গা ভাসাতে পাহাড়ি কন্যা খাগড়াছড়িতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো সৌন্দর্য্য পিপাসু পর্যটক। জেলার প্রধানতম পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঈদের প্রথম দু‘দিনেই চোখে পড়ার মতো পর্যটক দেখা গেছে। সবখানে উপচেপড়া ভিড়। ইতোমধ্যে সাজেক ও খাগড়াছড়ির হোটেল আর কটেজ এর অধিকাংশ রুম বুকিং হয়েছে। আগামী ২/১ দিনের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়ার আশা করছেন পর্যটক সংশ্লিষ্টরা।
পাহাড়, ছড়া, নদী আর ঝরনার সম্মিলন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। সারা বছরই আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের রহস্যময় গুহা, ঝুলন্ত সেতু, রিছাং ঝরণা, জেলা পরিষদ পার্ক, মায়াবিনী লেকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্পট পর্যটকের পদভারে মুখরিত থাকে। জেলায় অনেকগুলো পর্যটন কেন্দ্র থাকলেও সবকিছুকে ছাপিয়ে এবারের ঈদে পর্যটকদের অপার আকর্ষনে টানে বদলে যাওয়া আলুটিলা ও আলুটিলার ব্যতিক্রমী দুটি ঝুলন্ত সেতু। এছাড়াও রহস্যময় গুহা ও রিছাং ঝর্ণায় প্রাণ জুড়ে যায় পর্যটকদের তা ছাড়া তৈদুছড়া ঝরণা, হাজাছড়া ঝর্ণা, দেবতা পুকুর, জেলার সীমান্ত শহর রামগড়ে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস অথাৎ বিডিআরের বর্তমানে বিজিবি’র ‘জম্ম স্থান’, কৃত্রিম লেক ও রামগড় ঝুলন্ত সেতুসহ প্রতিটি পর্যটন স্পর্ট এখন পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। যাতায়াত সুবিধার কারণে খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক ভ্রমণে যায় পর্যটকরা এতে বাড়তি লাভের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পরিবার নিয়ে প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি ভ্রমণে এসে রিছাং ঝর্ণা ও তারেং ঘুরে আলুটিলা পাহাড় থেকে পাখির চোখে শহর দেখা এবং রোমাঞ্চকর গুহা ভ্রমণ সানজিদা করিমের কাছে অত্যন্ত উপভোগ্য মনে হয়েছে। সানজিদা বলেন, ‘বাবা ও মায়ের সঙ্গে এই প্রথম খাগড়াছড়ি এলাম। সব মিলিয়ে খুব ভালো লেগেছে। আলুটিলা পাহাড় থেকে পুরো শহর চোখে দেখা যায়।’
খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরতে আসা রুমা বিশ্বাস বাসস’কে বলেন, খাগড়াছড়ির প্রকৃতি অসম্ভব সুন্দর। পাহাড়গুলো যেন আমার কাছে এসেছে। চারদিক শুধু পাহাড় দিয়ে ঘেরা। দেখতে আমার মনোরম লাগছে।
ঢাকা থেকে পড়ন্ত বিকেলে খাগড়াছড়ির জেলা পরিষদ পার্কে ঘুরতে আসা সাইফুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, বাংলাদেশ যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর তা খাগড়াছড়ি না আসলে বুঝার উপায় নেই। এখানে দেখার মতো অনেক কিছু আছে।
প্রকৃতি পুরোপুরি সবুজ না হওয়ায় এবং ঝরনায় পানির পরিমাণ কম থাকায় আলুটিলা ভ্রমণে আসা ফাহমিদা হক ও জাহিদুল মতিনের কাছে এবারের পাহাড়ের রূপ কিছুটা রুক্ষ মনে হয়েছে। ফাহমিদা বলেন, ‘আমরা ঈদের প্রথম দিনই খাগড়াছড়ি এসেছি। এরপর সাজেকে এক রাত ছিলাম। এখন একটু রুক্ষ সময়। প্রকৃতি পুরোপুরি সবুজ হয়নি। তারপরও প্রচুর ভিড় সেখানে।
ার জাহিদুল বলছিলেন, ‘তাপমাত্রা কম থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করেছি। এ সময়ে ঝর্ণায় পানি কিছুটা কম।’ ঢাকা থেকে আসা আরেক পর্যটক শরীফুল ইসলাম টানা বন্ধে খাগড়াছড়ি ও সাজেক ভ্রমণ করেছেন। পাঁচ বছর পর খাগড়াছড়িতে এসে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র ও জেলা পরিষদ পার্কের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন তিনি। শরীফুল বলেন, পুরো ভ্রমণটি তার কাছে উপভোগ্য লেগেছে।
পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ায় খুশি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। খাগড়াছড়ির অভিজাত আবাসিক হোটেল ‘গাইরিংয়ের’ ব্যবস্থাপক প্রান্ত ত্রিপুরা বলেন, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে নয়নাভিরাম নানান দৃশ্য, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা,সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি তৈরির নজরকাড়া হাজারো চিত্র। চার পাশে বিছিয়ে রাখা শুভ্র মেঘের চাদরের নীচে রয়েছে সবুজ বনারাজিতে ঘেরা ঢেউ খেলানো অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়। তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে আঁকা-বাঁকা সড়ক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে খাগড়াছড়িতে আসা পর্যটকদের থাকার-খাওয়ার রয়েছে বহু হোটেল-রেষ্টুরেন্ট। তিনি বলেন, ‘আমাদের হোটেলে ৪০টির বেশি কক্ষ আছে।‘ঈদের পরদিন থেকে আমাদের হোটেলের ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং আছে। আগামী শুক্র-শনিবার পর্যন্ত পর্যটকদের এমন ভিড় থাকবে।’
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক চন্দ্র কিরণ ত্রিপুরা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করতে। প্রতিদিন আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে চার থেকে পাঁচ হাজার দর্শনার্থী আলুটিলা ভ্রমণ করছেন।’
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সর্বদা সতর্ক থাকার পাশাপাশি যেকোনো বিপদে সব সহযোগিতা দেয়ার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
খাগড়াছড়ি ট্যুরিস্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক নিশাত রায় বাসস’কে বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় আমরা সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত আছি। ‘পর্যটকদের কোনো ধরনের সমস্যা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় পর্যটকেরা ভ্রমণে গিয়ে যদি কোনো বিপাকে পড়ে সেক্ষেত্রে তারা যদি ৯৯৯-এ কল দিলে, আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করতে পারব।’ আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক আছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সাদা পোশাকে অনেকে টহল দিচ্ছেন।
ঈদের ছুটিকে ঘিরে পর্যটকদের আগমনে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পাহাড়ি জনপদ। পর্যটকদের পদচারণায় চাঙ্গা হয়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদে পর্যটকদের ঢল নেমেছে পাহাড়ে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের পর্যটন শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আশা সংশিষ্টদের । ঈদের এই বন্ধে খাগড়াছড়িতে ইতোমধ্যে অন্তত ১০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছে।