শিরোনাম

রেদওয়ান আহমদ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৫ মার্চ, ২০২৫ (বাসস): বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত বাড়ছে বিষাক্ত ধাতু দূষণ। এর প্রভাব পড়ছে দেশের মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক পরিবেশ এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তায়। বিশেষ করে বাকখালী নদী ও মহেশখালী চ্যানেলে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান ও গবেষণা সহকারী কাজী নুসরাত জাহান ঐশীর যৌথ গবেষণায় এই উদ্বেগজনক ফলাফল উঠে এসেছে।
গত বছর ২০ ডিসেম্বর এই গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’(এলসেভিয়ার)-এ প্রকাশিত হয়। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাস থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে চলা এই গবেষণা গবেষকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্পন্ন হয়। এর শিরোনাম ছিল- ‘ট্রেস এলিমেন্ট ডাইনামিক্স অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ইনডিসিস ইন কোস্টাল সেডিমেন্টস অ্যালং দ্য সাউথইস্টার্ন বাংলাদেশ।’
গবেষণাটি মাতামুহুরি নদী, বাকখালী নদী, মহেশখালী চ্যানেল, নাফ নদী এবং সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। আধুনিক আইসিপি-এমএস প্রযুক্তি (আধুনিক ল্যাব টেকনোলজি) ব্যবহার করে নদী ও মোহনার পলিতে জমে থাকা ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম, নিকেল এবং সীসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, বাকখালি নদী ও মহেশখালী চ্যানেল উপকূলীয় দূষণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এই দুই স্থানে পিএলআই মান ২-এর বেশি, যা উচ্চ মাত্রার দূষণের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত সবচেয়ে উদ্বেগজনক ধাতু হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ক্যাডমিয়াম। এর উচ্চ বিষক্রিয়ার কারণে পিইআর মান বাকখালিতে ৩৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ২৯৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা ‘অত্যন্ত উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকি’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যদিও নাফ নদী ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে তুলনামূলকভাবে দূষণের মাত্রা কম রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দূষণের মূল কারণ শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগর পয়োনিষ্কাশন থেকে নিঃসৃত পানি, জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম, বন্দরভিত্তিক নৌ-চলাচল এবং কৃষি ও নগর এলাকা থেকে বয়ে আসা দূষিত নদীনিষ্কাশন। চট্টগ্রাম ও মহেশখালী অঞ্চলে এসব কার্যক্রমের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে দূষণের চাপও বেশি।
আর এই ধাতু দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদের ওপর। পলিতে জমে থাকা ধাতু ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও প্লাঙ্কটনের শরীরে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছ ও চিংড়িতে চলে আসে। এর ফলে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমতে থাকে। এতে একদিকে যেমন জেলেদের আয় কমছে, অন্যদিকে দূষিত মাছ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানান গবেষকরা।
দূষণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ম্যানগ্রোভ বন, নদী-মোহনার তলদেশের জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক খাদ্যচক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলে কিছু অঞ্চলে ইকোসিস্টেম অস্থিতিশীলতা ও স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্যসম্পদের পতন (ফিশারিজ কল্যাপস) ঘটতে পারে, যা উপকূলীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
গবেষণায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বাকখালী নদী ও মহেশখালী চ্যানেলকে ‘প্রায়োরিটি পলিউশন হটস্পট’ বা ‘সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত দূষণকেন্দ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ, নিয়মিত পানি ও পলি পর্যবেক্ষণ, জাহাজ ভাঙার কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা সহকারী কাজী নুসরাত জাহান ঐশী বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বাকখালী নদী ও মহেশখালী চ্যানেলে ভারী ধাতু দূষণের মাত্রা সর্বোচ্চ। যার সম্ভাব্য উৎস হলো শিল্পবর্জ্য, জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম, বন্দর ও সামুদ্রিক পরিবহন, নগরবর্জ্য এবং কৃষি রাসায়নিক। অন্যদিকে নাফ নদী ও সেন্ট মার্টিন এলাকায় দূষণ কম, কারণ সেখানে শিল্প ও নগর কার্যক্রম সীমিত এবং মানবসৃষ্ট দূষণের প্রভাবও কম।’
তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের পলিমাটিতে ক্ষতিকর ক্ষুদ্র ধাতু দূষণ, এর সম্ভাব্য উৎস এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নির্ণয় করা। এই ফলাফল উপকূলীয় পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়তা করবে। এটি কার্যকর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
গবেষণা প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান বলেন, ‘বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ধাতু দূষণ দেশের মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য স্পষ্ট হুমকি। টেকসই মৎসসম্পদ ও সুস্থ উপকূলীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর নীতি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ জোরদার করা জরুরি। আমাদের এই গবেষণা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজিএস) অর্জনে সহায়ক, বিশেষ করে নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন (এসডিজি ৬), জলবায়ু কার্যক্রম (এসডিজি ১৩), জলজ জীবন (এসডিজি ১৪) এবং স্থলজ জীবন (এসডিজি ১৫) বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’
গবেষণাটিকে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে এবং বায়োডাইভারসিটি নষ্ট হচ্ছে। ভারী ধাতুর দূষণ উপকূলীয় উদ্ভিদ, মাছ ও মানুষকে প্রভাবিত করছে, যা পরিবেশের ভারসাম্যকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিষাক্ত ক্যাডমিয়ামের মাত্রা বেড়ে গেলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়বে। এ ধরনের গবেষণা গুরুত্ব বিবেচনায় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।’
অধ্যাপক মামুন চৌধুরী জানান, গবেষকরা আধুনিক আইসিপি-এমএস প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন, যা বিশ্বব্যাপী খুবই সীমিত।
তিনি বলেন, ‘এই গবেষণা একটি ভালো স্টার্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। দূষণের জন্য শিল্পবর্জ্য, জাহাজভাঙা কার্যক্রম, বন্দর ও সামুদ্রিক পরিবহন, নগর বর্জ্য এবং কৃষি রাসায়নিকের ব্যবহারকে দায়ী করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও স্পেসিফিকভাবে দূষণের উৎস নির্ণয় করা সম্ভব হবে।’