শিরোনাম

\ বিপুল ইসলাম \
লালমনিরহাট, ৩ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : দারিদ্র্য আর অনটনের ঘর থেকে উঠে এসে আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সান্তনা রানী রায় (৫০)। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও সততার পথ ধরে তিনি আজ লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী বাজারের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান ‘এস বি টেইলার্স’-এর কর্ণধার। তার সাফল্য শুধু পারিবারিক আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনই ঘটায়নি, বরং স্থানীয় নারীদের জন্যও সৃষ্টি করেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
জেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের রুদ্ররাম গ্রামের বাসিন্দা সান্তনা রানী অল্প বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্বামী বিধুভূষণ রায় স্থানীয় ডাকঘরে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজ করতেন। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত টানাপোড়েনের মুখোমুখি হতে হতো পরিবারটিকে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেও তিনি থেমে থাকেননি; অভাবকে জয় করতে বেছে নেন দক্ষতা অর্জনের পথ।
প্রথমে স্থানীয় সংস্থা আরডিআরএস-এর মাধ্যমে দর্জি প্রশিক্ষণ নিয়ে সেলাই কাজে পারদর্শী হয়ে ওঠেন তিনি। পরবর্তীতে একটি সংস্থার সহযোগিতায় প্রায় ৩০০ নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেন। তার হাত ধরে অনেক নারী আজ স্বাবলম্বী। কয়েক বছর ট্রেইনার হিসেবে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করলেও তা দিয়ে পরিবারের পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়নি।
অবশেষে ২০০০ সালে একটি এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বড়বাড়ী বাজারের মহিলা মার্কেটে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এস বি টেইলার্স’। শুরুটা ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। তবে ধীরে ধীরে মানসম্মত ও রুচিশীল পোশাক তৈরি করে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে ব্যয় বাদ দিয়ে বছরে প্রায় আড়াই লাখ টাকার বেশি আয় করছেন। তার প্রতিষ্ঠানে ৩ থেকে ৫ জন স্থানীয় নারী পার্টটাইম কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
সান্তনা রানী বলেন, পরিশ্রম আর সততাই আমার মূল শক্তি। এই আয়ে স্বামীর চিকিৎসা, মেয়েদের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারছি।
তার বড় মেয়ে আশা লতা রায় মৌ রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে বিজয়া রায় সৃষ্টি লালমনিরহাটের মজিদা কলেজ-এ ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়ণরত। বড় মেয়েকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ছোট মেয়েকে চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চান তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সান্ত¦না রানী জানান, সরকারি সহায়তা পেলে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে আরও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চান। দোকানের পাশের অব্যবহৃত জায়গায় বড় পরিসরে দর্জি কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
দোকানের নিয়মিত গ্রাহক আসিয়া বেগম, মোগলিজা বানু ও তরুণী ইয়াসমিন আক্তার জানান, আধুনিক ও মানসম্মত পোশাক তৈরিতে এস বি টেইলার্স ইতোমধ্যে এলাকায় আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বড়বাড়ী বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাজেদুল ইসলাম সাজে তাকে একজন সৎ ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশে সরকার বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানে প্রশাসন ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
তরুণদের উদ্দেশে সান্তনা রানীর আহ্বান, চাকরির পেছনে শুধু না ছুটে দক্ষতা অর্জন করুন। অল্প পুঁজিতেও টেইলার্স ব্যবসা শুরু করে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।
সংগ্রাম, সাহস ও আত্মবিশ্বাস—এই তিন শক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সান্তনা রানীর সাফল্যের গল্প আজ লালমনিরহাটের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা।