বাসস
  ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:১২
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:২২

ভাষা সৈনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের নাম চিরভাস্বর

ভাষা সৈনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ । ফাইল ছবি

।। মুহাম্মদ আমিনুল হক।।

সুনামগঞ্জ, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশের ভাষা সৈনিকদের মধ্যে যারা স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জের দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের নাম চিরভাস্বর। তিনি বাংলা ভাষা আন্দোলনের একজন সমর্থক ও সক্রীয় কর্মী ছিলেন। আন্দোলনে সমর্থনের দায়ে, ১৯৫৪ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়। যদিও একই বছর আবার তাকে বহাল করা হয়। ভাষা আন্দোলনে তার সমর্থন খুব জোরালো ছিল। ১৯৪৮ সালে তিনি নওবেলাল লিখেন। এছাড়াও তিনি কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিসের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ায় তাকে তমদ্দুন মজলিসের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। পাশাপাশি সাংবাদিকতা করেছেন কিছুকাল। সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নওবেলাল-এর সম্পাদক ছিলেন। এই সাপ্তাহিকই ভাষা আন্দোলনের সময় আলোড়ন তুলেছিল যুবসমাজে এবং তিনি সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। ধারণা করা হয়, তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কোনো দিনই তাঁকে এ কারণে ‘প্রিয়জন’ মনে করতে পারেনি। ফলে কোনোকালেই তিনি বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিয়েও সরকারি চাকরি পাননি।

ভাষা সৈনিক দেওয়ান আজরফের সাত পুত্র, দুই কন্যা এবং তাদের পঁচিশজন ওয়ারিশ। আর অগণিত ছাত্র ও ভক্ত রয়েছেন।

সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে দেওয়ান আজরফ ১৯৩০ সালে সম্মানের সহিত বিএ পাশ করেন এবং ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি সুনামগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে চাকরিতে যোগদান করেন। সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে চাকরি শেষে তিনি বিভিন্ন কলেজে শিক্ষাদান করেছেন। এমনকি তিনি ঢাকার আবুজর গিফারি কলেজে ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন এবং ইসলাম শিক্ষা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পাঠদান করেন। আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একজন সমর্থক হয়ে, আসামে মুসলিম অভিবাসীদের ওপর হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে ১৯৪৬ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন তিনি এবং পরবর্তীতে আসাম প্রাদেশিক কমিটিতে 
নির্বাচিত হন। ১৪৪ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে তাকে ১০ মাসের জন্য কারাদণ্ড দেয়া হয়।

১৯৬১ সালে ভারতের দিল্লিতে ইন্দো-পাক কালচারাল কনফারেন্সে, ১৯৬৩ সালে ইরাকের বাগদাদে প্রথম মুসলিম দার্শনিক আল-কিন্দির মৃত্যু সহস্র বার্ষিকী অনুষ্ঠানে, ১৯৮১ সালে বিশ্বভারতীতে, ১৯৮৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ধর্ম ও দর্শন সম্মেলনে, ১৯৮৫ সালে ইতালির রোমে ধর্ম সম্মেলনে, রোমের সম্মেলনে তাঁর পঠিত প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘হোলিনেস অব ইসলাম অ্যান্ড ক্রিশ্চিনিয়াটি’। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন খ্রিষ্টধর্মীয় নেতা দ্বিতীয় জন পল। খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের শতাধিক বুদ্ধিজীবীর কাছে তাঁর পঠিত প্রবন্ধ ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে।

জন পোপ পল ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে ঘড়ি ও ক্রুশ উপহার দেন। প্রায় অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮৬ সালে, তেহরানের সম্মেলনে; তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ একাধিক মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিদ্বৎসমাজের সদস্যরা তাঁর অটোগ্রাফ সংগ্রহে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন ফারসি ও ইংরেজিতে।

১৯৬৮ সালে একবার বাঞ্ছারামপুরে এক জলসায় দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি সে দাওয়াত কবুল করতে পারেননি; এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ডাকযোগে একটি দু লাইনের ছড়া পাঠানো হয় তাঁর ঠিকানায়। লেখক অজ্ঞাত। ঠিকানা অবশ্য আছে, বাঞ্ছারামপুর, বি-বাড়িয়া। লাইন দুটি এ রকম, ‘তাকে যায় না করা মাফ/ সে একটা আস্ত জিরাফ।’ ছড়াটি পড়ে মন খারাপের বদলে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘যে এই লাইন দুটি লিখেছে, সে আসলে খোঁজখবর রাখে। এই নাম আমাকে দিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।’

বিদ্রোহী কবি ছাড়াও ‘জিরাফ’ নামে ডাকতেন আরও দুজন। একজন তাঁর শ্রদ্ধেয় ‘স্যার’ কাজী মোতাহার হোসেন, অপরজন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু অধ্যাপক সাইদুর রহমান। তাঁর অপর বন্ধু জিসি দেব নামটি শুনলে ক্ষিপ্ত হতেন।

সিলেট বিভাগে তাঁর একাধিক পরিচয় জনশ্রুতি আছে। তিনি জমিদারপুত্র, জমিদার, রাজনীতিক, ভাষাসংগ্রামী ও শিক্ষাবিদ। জমিদার হয়েও তিনি নানকার আন্দোলনের সমর্থক; অকাতরে জমিজমা বিলিয়ে দেন নানকারদের মধ্যে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও ব্রিটিশদের কৃপালাভের চেষ্টা না করে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ধার্মিক পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি সময় কাটান স্বামী বিবেকানন্দের আশ্রমে।

‘জন্মেছ যখন, দাগ রেখে যাও,’ স্বামীজির এই কথায় তিনি অনুপ্রাণিত হন। তিনি সাধারণ, তিনি গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি আসাম উচ্চ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

গণভোটের সময় দেওয়ান আজরফ মাওলানা ভাসানীর সাথে এক হয়ে কাজ করেছিলেন। আজ যে সিলেট ভারতের না হয়ে বাংলাদেশের হয়েছে, তা এক কঠিন আন্দোলনেরই ফসল। সিলেটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন মানুষের সমর্থন আদায়ের জন্য। লোকে হয়তো সে কারণেই বলে, তিনি ইতিহাসের পাতায় উচ্চারিত এক নাম। 

মাওলানা ভাসানীর ডাকে ১৯৪৭ সালের মে মাসে, আসাম সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন তিনি। এ অপরাধে তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। তাঁর স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভবা। কারাগার থেকে তিনি চিঠি পাঠান বাড়িতে, ‘যদি মেয়ে হয়, নাম রেখো মুক্তি, ছেলে হলে আজাদ।’

‘আজাদি আন্দোলনের সৈনিক’ পুরস্কৃত হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো নানা হয়রানি ও নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন। তার সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো সরকারি চাকরি তাঁর হয় নি।

তিনি কিছুদিনের জন্য, পাকিস্তান দার্শনিক কংগ্রেসের একজন সদস্য, এবং কোষাধ্যক্ষও ছিলেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত, তিনি বাংলাদেশ দার্শনিক এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।

পঁচিশে মার্চের পর তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর কলেজের প্রিয় ছাত্র ফারুক ইকবাল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ, যার জানাজা পড়িয়েছিলেন তিনি।

ভাষা সৈনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের তৎকালীন খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক এর কাছে বলেছিলেন তাঁর মা-বাবার পাশেই যেন তাঁকে দাফন করা হয়।’

দোহালিয়া গ্রামের লোকেরাই স্বেচ্ছায় তার বাবা মরহুম দেওয়ান আসফ রাজা চৌধুরী ও মরহুমা রওশন হুসেইন বানুর কবরের পাশে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফকে দাফন করেন। 

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১৯০৬ সালের ২৫ অক্টোবরে লক্ষণশ্রীর, তেঘরিয়া গ্রামের তাঁর নানা মরমি কবি দেওয়ান হাসন রাজার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা: দেওয়ান আসফ রাজা চৌধুরী, মাতা: রওশন হুসেইন বানু। 

বাবা দেওয়ান আসফ রাজা ছিলেন জমিদার এবং আসাম-বেঙ্গল খিলাফত আন্দোলনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে কংগ্রেসের সহ-সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দেওয়ান আজরফ তাঁর তৃতীয় সন্তান। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ দোহালিয়া মাইনর স্কুলে, পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়, এমসি কলেজ, কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ফার্সী, সংস্কৃত, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। 

তিনি কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও তাঁর প্রথম গল্পের বই ছিল সূর্য। এছাড়াও উপন্যাস লিখেছেন একাধিক (আত্মজৈবনিকসহ)। জাগ্রত অতীত, নয়া জিন্দেগি ও সোনাঝরা দিনগুলি। তবে দর্শন ও ধর্মবিষয়ক শতাধিকের উপরে বই লিখেছেন। জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছে ৫৪টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দর্শনের নানা প্রবন্ধ, ইসলাম ও মানবতাবাদ, আবুজর গিফারী (ইংরেজিতে লেখা), সিলেটে ইসলাম, কবির দর্শন, ধর্ম ও দর্শন, মরমি কবি হাসন রাজা, তমদ্দুনের বিকাশ, কান্ট, হেগেল ও রয়েল, জিয়োরদানো ব্রুনোর শাস্তি, দর্শনের কথা, বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শন।

তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে; স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, আন্তর্জাতিক সংহতি পুরস্কার, অতীশ দীপংকর পুরস্কার, একুশে পদক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার। আজীবন শিক্ষকতা করে গেছেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আবুজর গিফারী কলেজ এখন বাংলাদেশের অন্যতম। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এমসি কলেজ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, নরসিংদী কলেজ, মতলব কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপক।

ভাষা সৈনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১ নভেম্বর ১৯৯৯ খ্রীষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। এই মহীরুহ ব্যাক্তিকে আজও মানুষ শ্রদ্বাভরে স্মরণ করেন।