শিরোনাম

মো. তানিউল করিম জীম
ময়মনসিংহ (বাকৃবি), ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দেশে উচ্চশিক্ষিত হাজারো তরুণের মাঝে দিনদিন বেকারত্বের অভিশাপ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অন্যদিকে আমাদের খাবার টেবিলে প্রতিনিয়ত হানা দিচ্ছে 'অদৃশ্য বিষ' বা খাদ্যে ভেজাল। বাজার থেকে কেনা মাছ, মাংস, সবজি, ফল-মূল কিংবা দুগ্ধজাত পণ্যের মাধ্যমে আমরা নিজের অজান্তেই যেন শরীরে মরণব্যাধিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এই সংকটময় মুহূর্তে পুরো জাতির কাছে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করা এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে সবাই কথা বললেও কাজ করা মানুষের সংখ্যা সামান্য। সুস্থ জাতি দেশের সম্পদ। তাই সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের একটি গুরু দায়িত্ব।
এই দ্বিমুখী সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল উদ্যমী সাবেক শিক্ষার্থীরা মিলে শুরু করে বিশেষ উদ্যোগ। যার মূলে রয়েছে নিজে উদ্যোক্তা হয়ে বেকারত্ব দূরীকরণ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিতের অঙ্গীকার। নিরাপদ কৃষি, নিরাপদ খাদ্য এবং নিরাপদ জীবন এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ‘গ্রাজুয়েট এগ্রো' এর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করছে তারা। প্রথমে শুরু হয় কাঁচাবাজার ডট কম ডট বিডি এর মাধ্যমে পথ চলা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এক পূণর্মিলনী চলাকালীন সময়ে দেখা যায় একটি সাজানো স্টলে একঝাঁক তরুণ উদ্যোক্তা।
তাদের মধ্যে এমজে হাসান নামে এক তরুণের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, চাকরি দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং মুনাফাভিত্তিক ব্যবসার পরিবর্তে মানুষের কাছে সত্যিকারের বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাবার পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে কাচাবাজার ডট কম ডট বিডি নামক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। অনলাইনে কাজ করতে গিয়ে আমরা উপলব্ধি করি যে, বাংলাদেশের মানুষ সরাসরি অভিজ্ঞতায় বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাস থেকেই ডিজিটাল গণ্ডি পেরিয়ে আজ অফলাইনেও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি ।
কেন মানুষ গ্রাজুয়েট এগ্রো থেকে পণ্য কিনবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে 'গ্রাজুয়েট এগ্রো' একটি অনন্য মডেল। কেননা এতে বিশেষজ্ঞ যেমন-কৃষিবিদ, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে পরিচালিত একটা প্রতিষ্ঠান। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে বীজের মান ও ফলনের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়।
প্রকৌশলীরা তাঁদের প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে বিশেষ অবদান রাখছে।
সহজলভ্য পণ্যের তালিকা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে এমজে হাসান বলেন, এগ্রো গ্র্যাজুয়েটের পণ্যের তালিকার মধ্যে রয়েছে, সুন্দরবন ও পাহাড় থেকে সংগৃহীত এবং নিজস্ব ফার্মে চাষকৃত খাঁটি মধু। এছাড়াও কালোজিরা ফুলের, লিচু ফুলের ও সরিষা ফুলের মধু। মিষ্টিজাত খাবারের তালিকায় রয়েছে পাবনার ঐতিহ্যবাহী প্যারা সন্দেশ। রয়েছে নিজস্ব বাগানে উৎপন্ন নিরাপদ ও কেমিকেলমুক্ত তাজা ফল (ড্রাগন, প্যাশন ফ্রুট, আঙুর ফল)।
শস্যের মধ্যে রয়েছে কালো চাল, যবের আটা, মাল্টি গ্রেইন আটা এবং যবের ছাতু। এছাড়াও মসলা, বিভিন্ন জাতের আম, খাঁটি দেশি ঘি, কাঠের ঘানিতে ভাঙানো বিশুদ্ধ সরিষার ও নারিকেল তেল। গুড়ের মধ্যে রয়েছে, পাটালি, দানাদার, ঝোলা, চকলেট। কাঁচাবাজার ডটকমে বিটরুট, মিষ্টিআলু, শতমূলী অশ্বগন্ধা গুঁড়া, এমনকি সজনে পাতার গুঁড়াও পাওয়া যায়। এছাড়াও রয়েছে সরাসরি সৌদি আরব, মিশর ও তিউনিসিয়া থেকে আমদানিকৃত মেডজুল খেজুর, সুক্কারি, আজওয়া , মরিয়ম ও (প্রিমিয়াম), দাবাস খেজুর। এখানেই শেষ নয় কোনো প্রকার প্রিজারভেটিভ ছাড়া সরাসরি সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা মাছসহ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সংগৃহীত শুঁটকি।
তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের অনুপস্থিতি থাকায় সরাসরি কৃষক ও উৎপাদনকারীর কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানো হয়। ফলে কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয়। এখানে মুনাফার চেয়ে সেবাকে বড় করে দেখা হয়।
বর্তমানে কাচাবাজার প্রায় ৫৩টি পণ্য বিপণনের জন্য কাজ করছে। ২০১৮ সালে থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে কাঁচাবাজার ডটকম ২৪/৭ রয়েছে ক্রেতার পাশে। এছাড়াও কোরবানি উপলক্ষে রয়েছে কোরবানির নিরাপদ পশু পালন প্রজেক্ট।
তারা আরো জানান, গ্রাজুয়েট এগ্রো এখন এক বিস্তৃত ভিশন নিয়ে কাজ করছে। সাধারণ মানুষ যেন তাদের সঞ্চিত অর্থ নিশ্চিন্তে এবং স্বচ্ছ উপায়ে কৃষি খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন, তার জন্য একটি স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে।
শুধু স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নয়, এগ্রো গ্র্যাজুয়েটের রয়েছে একটি শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করার বিশেষ পরিকল্পনা। তা হলো-
১.আবাসন নিশ্চিতকরণ: দীর্ঘমেয়াদী পেশাদার জীবনে আবাসনের অনিশ্চয়তা দূর করতে আমাদের আবাসন প্রকল্প।
২.চিকিৎসা সংস্কার: বাণিজ্যিক ব্যবস্থার বাইরে এসে মানবিক ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৩.সামাজিক সুরক্ষা: অবহেলিত মানুষের উন্নয়ন এবং সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৪.সম্মিলিত প্রচেষ্টা: ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার বদলে সামষ্টিক কাজের মাধ্যমে সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠন করা।
গ্র্যাজুয়েট এগ্রো দলের আব্দুর রহিম সাগর বলেন, আমরা আগামীর ভবিষ্যৎ হতে চাই। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ও কৃষিবিদ নিয়ে যে সমাজ তৈরি হয়েছে সেই সমাজে যেন আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারি। আমরা মানুষের আবাসন ব্যবস্থায় কাজ করতে চাই। আমাদের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য আমাদের সাথে থাকা চিকিৎসকদের নিয়ে কাজ করতে চাই। আগামী সমাজ ও ভবিষ্যৎ গঠনে আমাদের সকলকে একত্রিত হতে হবে এবং একত্রিত ভাবে কাজ করতে হবে।'