শিরোনাম

ঢাকা, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : নারীদের এগিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবস্থান করে নেওয়াটা পুরুষের জন্য সহজ হলেও নারীদের জন্য কঠিন। সেই কারণেই নারীদের এগিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
আজ রোববার রাজধানীর বিস মিলনায়তনে এক গোলটেবিল বৈঠকে এ মনোভাব ব্যক্ত করেন জাইমা রহমান। ‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী : অবদান ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আয়োজন করে উইমেন ইন ডেমোক্রেসি (উইন্ড)।
জাইমা রহমান বলেন, রাজনীতিতে যেসব নারী সক্রিয়, নিজ অঙ্গনে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একটি আচরণবিধি থাকা উচিত।
জাইমা রহমান তার ভাবনাটি তুলে ধরে বলেন, ‘সেফটির দিক থেকে যদি কোনো নারী নেত্রী বা স্টুডেন্ট লিডারের কিছু হয়, তাহলে দলগুলো লিগ্যাল কোড অব কন্ডাক্টের মাধ্যমে নারীকে প্রটেক্ট করবে। অর্থাৎ যদি নারীর কিছু হয়, দল দায়িত্বটা নেবে যে, আমরা উনাকে প্রটেক্ট করব, উনার পাশে থাকব।’
লন্ডনে আইনে পড়াশোনা করা জাইমা রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ইতোমধ্যে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বাবা তারেক রহমানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নিজেকে অনেকটাই যুক্ত করেছেন।
জাইমা রহমান মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবস্থান করে নেওয়াটা পুরুষের জন্য সহজ হলেও নারীদের জন্য কঠিন। সেই কারণেই নারীদের এগিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
জাইমা রহমান বলেন, নারীদের উঠে আসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে হবে। সব দলকে এই দায়িত্বটা নিতে হবে।
‘একদম ছায়ার মতো, তালগাছের ছায়ার মতো যদি কেউ না থাকে মেন্টর, তাহলে ওই ছোট গাছটা কীভাবে আবার বড় হবে?’, বলেন জাইমা রহমান।
রাজনীতিতে নারীদের উঠে আসার ক্ষেত্রে তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবেও সহায়তার ওপরও জোর দেন জাইমা রহমান। তিনি বলেন, ‘তাদেরকে সুযোগ দেওয়া উচিত দাঁড়ানোর জন্য। যার মেধা আছে, দাঁড়ানোর জন্য কোনো একটা সংসদীয় আসন বা স্থানীয় সরকারে।’
সহায়তার পাশাপাশি নারীনেত্রীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন জাইমা রহমান।
‘উইমেন ইন ডেমোক্রেসি’র এই গোলটেবিলে অংশ নিয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারীদের নেতৃত্বের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানোর প্রবণতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
ফারাহ কবির বলেন, ‘এত দিন বিভিন্ন জায়গায় নারীরা নেতৃত্বে ছিলেন, কিন্তু গত ১৮ মাসে নতুন করে মনে হয়েছে, এসব নারী কি এখন সবাই ফিরে যাবে? এভাবে ডিভাইড অ্যান্ড রুলের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাই দেশের মানুষকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কী ধরনের নেতৃত্ব চায়।’
দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে ফারাহ কবির বলেন, এই ‘নোংরা সংস্কৃতির কারণে’ নারীদের বলা হয়, তারা এখানে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। এই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে নারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের রাজনীতিতে অংশ নিতে হবে।
বিগত সময়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখেনি বলেও অভিযোগ করেন ফারাহ কবির।
গোলটেবিলে অংশ নিয়ে আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটে বৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও কীভাবে এই প্রতিশ্রুতিকে আরো শক্তিশালী করা হবে, তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি।
সারা হোসেন বলেন, সম্প্রতি অনেক নারী বক্তব্য দিয়েছেন, তারা পুরুষের অধীন থাকতে চান। পুরুষ তাদের পরিচালক, এটা তারা মেনে নিয়েছেন। ওই নারীদের এই বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত। তাহলে এসব বক্তব্য আর আলোচনায় আসবে না।
দেশের বিদ্যমান আইনে অনেক অর্জন আছে উল্লেখ করে স্বৈরাচারের দোহাই দিয়ে সব আইনকে যাতে মুছে দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান সারা হোসেন।
আইনজীবী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা গোলটেবিলে বলেন, গত ১৮ মাসে মেয়েরা একটা খেলায় এগিয়ে এসেছে, তা হলো আত্মরক্ষার খেলায়। বর্তমানে অনলাইনে ও অফলাইনে নারীদের স্লাটশেমিং ও হয়রানি আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে।
শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার বলেন, ‘আমরা চাই নির্বাচনে যারাই জয়ী হয়ে আসুক, তারা যেন নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন। কারণ, যতবার নারীদের পেছানোর চেষ্টা করা হবে, নারীরা লড়ে যাবে। আমাদের দুই পা পিছিয়ে দিলে আমরা চার পা এগিয়ে আসব।’
মুক্তিযোদ্ধা লুৎফা হাসান রোজি বলেন, সমান অধিকারের জন্য যে পরিবেশ দরকার, তা বাংলাদেশের সমাজে এখনো নেই। সমাজে এই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নারীকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আসতে হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যেসব নারী এগিয়ে এসেছিলেন, ৫ আগস্টের পর তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এখন নারীদের বিভিন্নভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করছে।
নারীদের বিরুদ্ধে যে সাইবার বুলিং হয়, তার বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা বন্ধে সবাইকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান উমামা ফাতেমা।
ডাকসুর কার্যকরী সদস্য হেমা চাকমা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরও নারীদের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। নারী যখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখে, সেটাকে ‘সেলিব্রেট’ করা হয় না। বরং তারা কী করছে, কী পরছে, সেটা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। কথা বলতে গেলে চুপ করিয়ে রাখা হয়।
টিভি উপস্থাপক কাজী জেসিনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা, ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসলিমা আখতার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, সাংবাদিক জায়মা ইসলাম, ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ তন্বি প্রমুখ।