বাসস
  ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:২৪

উপকূলীয় অঞ্চলসহ সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও ডাকাত দমনে নিরলস কাজ করছে কোস্টগার্ড

ছবি: বাসস

আজাদ রুহুল আমিন

বাগেরহাট, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও ডাকাত দমনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে কোস্টগার্ড। তবে ডাকাতদের দৌরাত্ম্য বন্ধে নৌবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবের সমন্বিত অভিযানে ডাকাত দলের সদস্যদের আটক করা হলেও পুরোপুরি তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমন করা যায়নি এখনও। তাই সুন্দরবনে জীবিকা আহরণে নির্ভরশীল লোকেরা এখনও হুমকিতে রয়েছেন। ডাকাত চক্রের নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা আহরণ ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে সুন্দরবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এছাড়াও জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে কয়েকটি ডাকাত দল বনজ সম্পদ লুণ্ঠন, জেলে ও বনজীবীদের অপহরণসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কার্যক্রম করে আসছে। ডাকাত চক্রের কর্মকাণ্ডে পর্যটন শিল্প, বাস্তুসংস্থান এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোস্টগার্ড তাদের দায়িত্বের অংশ হিসেবে সূচনালগ্ন থেকে ডাকাতের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করে আসছে।

কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা জানান, গত ২ জানুয়ারি (শুক্রবার) সুন্দরবনের গোলকানন রিসোর্ট হতে কানুরখাল সংলগ্ন এলাকায় কাঠের বোট যোগে ভ্রমণকালে ডাকাত মাসুম বাহিনী ২ জন পর্যটকসহ গোলকানন রিসোর্টের মালিককে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। পরে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কোস্টগার্ডকে অবগত করলে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে কোস্টগার্ড। গোয়েন্দা তথ্য, ড্রোন নজরদারি ও ফিনান্সিয়াল ট্রেসিং ব্যবহার করে টানা ৪৮ ঘণ্টা অভিযানের পর জিম্মিকৃত পর্যটক ও রিসোর্ট মালিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরো জানান, এ সময় ডাকাত চক্রের সদস্য কুদ্দুস হাওলাদার (৪৩), মো. সালাম বক্স (২৪), মেহেদী হাসান (১৯), আলম মাতব্বর (৩৮), অয়ন কুন্ডু (৩০), মো. ইফাজ ফকির (২৫), জয়নবী বিবি (৫৫) এবং মোছা দৃধা (৫৫) কে সুন্দরবন, দাকোপ এবং খুলনার বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করে দাকোপ থানায় হস্তান্তর করা হয়।

আটককৃত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে গতকাল বুধবার (৭ জানুয়ারি) কোস্টগার্ড খুলনার তেরোখাদা থানাধীন ধানখালী সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডাকাত বাহিনীর প্রধান মাসুম মৃধা (২৩) কে আটক করে।

পরবর্তীতে ডাকাত মাসুম মৃধার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনের গাজী ফিশারিজ সংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ৩টি দেশীয় ওয়ান শুটার পাইপগান, ৮ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৪ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১টি চাইনিজ কুড়াল, ২টি দেশীয় কুড়াল, ১ টি দা, ১টি স্টিল পাইপ ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও জিম্মি পর্যটকদের ৫টি মোবাইল ফোন এবং ১টি হাতঘড়ি উদ্ধার করা হয়। আটককৃত ডাকাত এবং জব্দকৃত আলামতের পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।

মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক আরও জানান, কোস্টগার্ড গত এক বছরে সুন্দরবনে ডাকাত ও জলদস্যু বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে মোট ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২টি হাতবোমা, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জামাদি, ৪৪৮ রাউন্ড কার্তুজ এবং জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষকে উদ্ধার করে। এসব অভিযানে মোট ৪৯ জন সক্রিয় ডাকাতকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তিনি আরো জানান, কোস্টগার্ডের ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে আছাবুর বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আনারুল বাহিনী, মঞ্জু বাহিনী এবং রাঙ্গা বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও, অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ একাধিক ডাকাত ও তাদের সহযোগী আটক করায় ছোট সুমন বাহিনী, ছোটন বাহিনী এবং কাজল মুন্না বাহিনী ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে সক্রিয় করিম শরিফ বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী ও দয়াল বাহিনীকে দমনে কোস্টগার্ড টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।

সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের জনবল বৃদ্ধি, কৌশলগত অবস্থানে নতুন স্টেশন স্থাপন, দ্রুতগামী স্পিডবোট সংযোজন এবং আধুনিক ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধি করা অতীব প্রয়োজন বলেও এই কর্মকর্তা জানান।

পাশাপাশি বন বিভাগের সমন্বিত অংশগ্রহণ সুন্দরবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে মর্মে প্রতীয়মান। যা বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সার্বিক সুরক্ষা তথা জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো ফলপ্রসূ হবে।

মিডিয়া কর্মকর্তা সিয়াম-উল-হক আরও বলেন, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, জেলে ও বনজীবীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে ভবিষ্যতেও নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখবে।