বাসস
  ১১ আগস্ট ২০২৬, ২০:০৭

এসডিজি অর্জন ও এলডিসি উত্তরণে উন্নয়ন অংশীদারদের বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান আইরিন খানের 

আইরিন খান। ফাইল ছবি

ঢাকা, ১১ আগস্ট, ২০২৬(বাসস): টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন অংশীদারদের আরও জোরালো সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।

‘এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: নীতি, অংশীদারিত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক তিন দিনের জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।

আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১) ও এসডিজি বাস্তবায়নে উন্নয়ন অংশীদারদের ভূমিকা’ শীর্ষক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাতিসংঘ, উন্নয়ন অংশীদার ও সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন। তাঁরা বাংলাদেশের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার এবং অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।

আইরিন খান বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জনের জন্য বর্তমানে একটি বিরল ‘সুযোগের জানালা’ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, উন্নয়নের অগ্রাধিকার ও এসডিজি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা আরও বিস্তৃত ও গভীর করতে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর দায়িত্বের একটি অংশ হবে দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করা। এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত বিষয়গুলো যাতে বৈশ্বিক পর্যায়েও যথাযথ গুরুত্ব পায়, তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।

আইরিন খান বলেন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ ভালো করেছে। তবে এসডিজি অনেক বেশি বিস্তৃত, আন্তঃসংযুক্ত ও চ্যালেঞ্জিং। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাতে থাকা বাকি সময় বাংলাদেশের জন্য কঠিন হলেও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সরকারের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে হারানো সময় পুষিয়ে নেওয়ার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

এসডিজি অর্জনে দেশের অভ্যন্তরীণ অংশীদার, বিশেষ করে নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।

আইরিন খান বলেন, ‘নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেবা পৌঁছে দেওয়ার শেষ ধাপে বাস্তবে তাঁরাই মানুষের কাছে যান।’

বাংলাদেশের এসডিজি বাস্তবায়ন এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধের প্রসঙ্গ তুলে আইরিন খান বলেন, এই সময় বাড়ানো হলে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের একটি টেকসই ও অপরিবর্তনীয় উত্তরণ নিশ্চিত করা সহজ হবে।

তিনি বলেন, দুটি প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য সংস্কার ও উন্নয়ন উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘দ্বৈত প্রণোদনা’ তৈরি করেছে।

আইরিন খান বলেন, সময় বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের তৈরি করা রোডম্যাপে চিহ্নিত কয়েকটি অগ্রাধিকার এসডিজি বাস্তবায়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাত শক্তিশালী করার সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা।

তিনি বলেন, ‘আগামী তিন বছরে আমরা এসব সংস্কারের অনেকগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি এসডিজি বাস্তবায়নে বিনিয়োগ ও গতি বাড়াতে চাই।’

এই দুই আন্তঃসম্পর্কিত অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন অংশীদারদের বাংলাদেশকে উভয় ক্ষেত্রেই উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমান সময়কে একটি বিরল সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে আইরিন খান বলেন, বড় ধরনের উন্নয়ন অগ্রগতি অর্জনে জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যন্ত ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কঠিন পরিস্থিতি ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে দেশকে সৃজনশীল হতে হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে উদ্যম, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়নের গতি বাড়াতে এসব শক্তিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান আইরিন খান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সৃজনশীল হতে হবে। অর্থের সংকট রয়েছে, তাই আমাদের হাতে থাকা শেষ পয়সাটিও কাজে লাগাতে হবে। তবে একই সঙ্গে এ দেশে উদ্যম, সৃজনশীলতা কিংবা উদ্ভাবনের কোনো ঘাটতি নেই।’

এসডিজি ও উন্নয়নের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আবদুল-আওয়াল উপস্থাপনা দেন। তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে সহজ শর্তের অর্থায়ন, ঋণ অবসান ও কারিগরি সহায়তাসহ আরও জোরালো সহায়তা চান।

আবদুল-আওয়াল বলেন, উন্নয়নের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের আরও শক্তিশালী অংশীদারিত্ব ও সম্পদ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য এ সহায়তা জরুরি।

তিনি বলেন, এসডিজির কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখনো দুর্বল। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। তবে দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো অগ্রগতি হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপ্রবণতা হ্রাস, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ উদ্যোগ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং স্বচ্ছ ও দক্ষ সেবা প্রদানকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ই-স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, শিক্ষা সংস্কার, যুব কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন উদ্যোগে অর্থায়ন এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ কয়েকটি প্রধান উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন আবদুল-আওয়াল। তিনি বলেন, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি করা।

উন্নয়ন অংশীদারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের আপনাদের সহায়তা প্রয়োজন।’ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রূপান্তর এবং কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সহজ শর্তের ঋণ, ঋণ অবসান, কারিগরি সহায়তা এবং উন্নয়ন অর্থায়নে আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেঝনিয়াক। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নেতৃত্বে প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদাররা তাদের সহায়তা সমন্বয় করতে এবং এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, এসডিজিকে আলাদা কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, সহনশীলতা ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা অর্জনের বাস্তব হাতিয়ার হিসেবে এসডিজিকে বিবেচনা করা উচিত।

ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেঝনিয়াক বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আমাদের ভূমিকা হলো যেখানে সম্ভব বাস্তবায়নে সহায়তা করা এবং এমন বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে আসা, যার সুফল মানুষ দেখতে ও অনুভব করতে পারে।’

তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ নতুন সুযোগ তৈরি করবে। তবে এর জন্য আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়নের উৎসে বৈচিত্র্য প্রয়োজন হবে।

তিনি আরও বলেন, অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান, বেসরকারি খাতের আরও বেশি অংশগ্রহণ, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অব্যাহত আন্তর্জাতিক সহায়তার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং, আইএফএডির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ভ্যালেন্টাইন আচানচো, ঢাকায় সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স দিয়েপাক এলমার, ব্রিটিশ হাইকমিশনের অ্যাডাম অ্যাসপডেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম কাউন্সেলর এডউইন কায়েককোয়েক, ইউএনডিপির ডেপুটি আবাসিক প্রতিনিধি সোনালি দয়ারত্নে, সুইডেন দূতাবাসের উন্নয়ন সহযোগিতা বিভাগের উপপ্রধান ফেলিক্স হেলগেসন, ইউনিসেফের সামাজিক নীতি ব্যবস্থাপক হাসিনা বেগম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ নীতিবিষয়ক কর্মকর্তা ড. ফারজানা দোরিন, বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা, ইউএনডিপির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ওয়াইস পাররে এবং ইউএনডিপির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি সরদার এম. আসাদুজ্জামান।