বাসস
  ১১ আগস্ট ২০২৬, ২১:০৮

বিএলআরআই উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোটপক্স ভ্যাকসিন হস্তান্তর হয়েছে: প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী

মঙ্গলবার সচিবালয়ে ভ্যাকসিন হস্তান্তর কার্যক্রম অনুষ্ঠানে কথা বলেন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। ছবি: পিআইডি 

ঢাকা, ১১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গামবোরো রোগের ভ্যাকসিন গোটপক্স বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন এবং খামারি পর্যায়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। 

তিনি বলেন, দেশীয় প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত এসব ভ্যাকসিন দেশের পোলট্রি খাতের রোগ নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।  

আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ভ্যাকসিন হস্তান্তর কার্যক্রম অনুষ্ঠানে তিনি একথা জানান। অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বিজ্ঞানী ও গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিকিৎসক, শিল্প উদ্যোক্তা, খামারি প্রতিনিধি এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহনেওয়াজ খান এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, আজকের আয়োজন শুধু একটি ভ্যাকসিন হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং গবেষণাগারে অর্জিত জ্ঞান ও উদ্ভাবনকে মাঠপর্যায়ের খামারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। 

দীর্ঘদিনের গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিএলআরআইয়ের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা ভ্যাকসিন দু’টি উদ্ভাবন করেছেন।তিনি বলেন, গবেষণাগারে কোনো উদ্ভাবন সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি যদি সাধারণ মানুষের কাজে না আসে, তাহলে সেই গবেষণার পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না। 

তাই গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং খামারি পর্যায়ে এর ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রী বলেন, বিএলআরআই উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গামবোরো ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। 

এর মাধ্যমে দেশের পোলট্রি খাতের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলো। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব ভ্যাকসিন খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিএলআরআইয়ের সব বিজ্ঞানী, গবেষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানান।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণাগারে কাজ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তি ও উপকরণ ব্যবহার করে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী সরকারের কৃষি ও কৃষকবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। 

কৃষির উন্নতি হলে দেশের অর্থনীতিরও উন্নতি হবে। তাই কৃষক ও কৃষিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে। মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পেলে কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। 

কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন হলে এর ইতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় আগামী দিনের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কৃষকের আর্থিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের দীর্ঘদিনের ঋণসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

যেসব ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন, তাদের সেই ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকের ঋণ মওকুফের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সরকার কৃষকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে ওই অর্থ পরিশোধ করেছে। ফলে কৃষকের ঋণের বোঝা কমেছে এবং একই সঙ্গে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকও তার পাওনা অর্থ পেয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খাল খননের কার্যক্রম অনেকটা বন্ধ থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেও বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতো।

মন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন খালকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিবছর নির্ধারিত খাল খননের কাজ করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগ তাদের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করছে।

তিনি জানান, চলতি বছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন খাল খননের কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু কাগজে-কলমে অগ্রগতি দেখালেই হবে না, বাস্তবে কাজের মাধ্যমে অগ্রগতি প্রমাণ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কৃষকের উৎপাদন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কৃষি কার্ডের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কৃষক কোন সময়ে কোন ধরনের পণ্য উৎপাদন করলে বেশি লাভবান হবেন, বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে এবং উৎপাদনের জন্য কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, এসব বিষয়ে আগাম তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সার, বীজসহ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কৃষকদের আরও কার্যকরভাবে সহায়তা করা হবে।

কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া গেলে উৎপাদন পরিকল্পনা আরও কার্যকর হবে এবং বাজারে অপ্রয়োজনীয় সরবরাহ সংকট বা অতিরিক্ত উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

মন্ত্রী আরও জানান, কৃষি কার্ডের নিবন্ধন কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ লাখ কৃষকের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই কৃষি কার্ডের নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতও দেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতের রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গামবোরোর মতো রোগ পোলট্রি খাতে উৎপাদন ও খামার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দেশীয়ভাবে কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিএলআরআইয়ের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে নেওয়ার ফলে দেশের খামারিরা ভবিষ্যতে আরও সহজে প্রয়োজনীয় টিকা পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।  একই সঙ্গে দেশের পোলট্রি শিল্পে রোগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়বে এবং ভ্যাকসিনের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।