শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ১৭ জুন, ২০২৬ (বাসস): বাংলার ফলের মাস জ্যৈষ্ঠ, এই মাসটি ‘মধুমাস’ নামে অধিক পরিচিত। মধুমাসের এই সময়ে মৌসুমি সুস্বাদু ফলে সয়লাব হয়ে উঠেছে নগরী ও জেলার বাজারগুলো এবং সড়কপাশের অস্থায়ী দোকানগুলো। ফলে স্থানীয় বাণিজ্যিক কর্মকা-ে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে অ-বাণিজ্যিক ও বসতভিটাভিত্তিক পারিবারিক ফলচাষের বিস্তৃতি ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বাজারগুলোতে এখন বিভিন্ন জাতের আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস ও জামরুলের প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ফলের চাহিদা ও বিক্রি ভালো থাকলেও বিপুল সরবরাহের কারণে মৌসুমের এ সময়ে দাম তুলনামূলক কম রয়েছে।
নগরীর প্রধান পাইকারি ফলের মোকাম রিয়াজউদ্দিন বাজার ও স্টেশন রোডের ফলম-ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শত শত স্থায়ী ফলের আড়ত ও গুদামে বিভিন্ন ধরনের ফলের বিপুল মজুত রয়েছে। বাহারি রঙ ও তাজা ফলের সমারোহে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমি ফলের ব্যাপক সরবরাহ স্থানীয় বাজারে বেচাকেনা বৃদ্ধি করে বাণিজ্যে নতুন গতি এনেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, স্থানীয় ও উন্নত জাতের নানা ধরনের ফল জেলার বিভিন্ন বাজারে উঠতে শুরু করেছে। সামনের সপ্তাহগুলোতে মৌসুমি ফলের সরবরাহ আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
গাউসিয়া ওয়্যারহাউসের মালিক মো. আরিফ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানান, বর্তমানে বাজারে হিমসাগর, হাড়িভাঙ্গা, আম্রপালি, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা ও মোহনভোগসহ জনপ্রিয় বিভিন্ন জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি গালা, রসা, খাজা, ছোট খাজা, বড় খাজা, দেশি ও মধু জাতের কাঁঠালও বিভিন্ন আড়তে বিক্রির জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।
বাজারে বর্তমানে বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না-১, চায়না-৩, বেদানা, মুজাফফরপুরী, এলাচি, কদমি ও বারি জাতের লিচু পাওয়া যাচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ করে চায়না-৩, বোম্বাই ও মাদ্রাজি জাতের উচ্চফলনশীল ও শংকর লিচুর বাণিজ্যিক চাষে কৃষকদের ব্যাপক আগ্রহের ফলে উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
হানি কুইন (জলডুগি), জায়ান্ট কিউ, ঘোড়াশাল, ক্যালেন্ডার, দেশি ও পাহাড়ি জাতের আনারসেরও পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বাজারে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে মান ও আকারভেদে কাঁঠালের দাম প্রতি পিস ১০০ থেকে ৩৫০ টাকা। অন্যদিকে আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ১২০ টাকা, আনারস প্রতি পিস ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং লিচু প্রতি ১০০টি ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায়। সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ফলের দামে ওঠানামা হতে পারে। তবে অধিকাংশ ফলের দাম বর্তমানে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। এদিকে ফলের দাম নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ফলম-ির পাইকারি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মোহাম্মদ আবদুল হালিম বলেন, মৌসুমি ফলগুলো যেমন পুষ্টিকর, তেমনি সুস্বাদুও। মৌসুমের শুরুতে দাম কিছুটা বেশি ছিল, তবে বাজারে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে আসছে।
ফল বিক্রেতা আলাউদ্দিন জানান, বাজারে সরবরাহ আরও বাড়তে থাকায় আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন ফলের দাম আরও কমতে পারে। এদিকে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়ি জেলার কৃষকেরা চলতি মৌসুমের ফলন নিয়ে আশাবাদী।
রাঙামাটির কৃষক অরুণজ্যোতি চাকমা বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর ফলের উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং ফলনও আশাব্যঞ্জক। অন্যদিকে জেলার বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর এলাকার লিচুচাষি মোস্তাক আহমেদ জানান, চলতি মৌসুমে ‘কালীপুর ব্র্যান্ড’ লিচু বিক্রি করে তিনি উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করেছেন, যা নিয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক জানান, চট্টগ্রাম জেলা ও রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানের পার্বত্য জেলাগুলোসহ মোট ৫০৬ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আমের চাষ হচ্ছে। এছাড়া ২১৬ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ করা হচ্ছে এবং লিচু ও আনারসের চাষ মিলিয়ে প্রায় ১০০ হেক্টর জমি রয়েছে।
তিনি আরও জানান, অ-বাণিজ্যিক ও বসতভিটাভিত্তিক ফলচাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুস্বাদু ফলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃতি ঘটছে। একই সঙ্গে আপেল, আঙুর, মাল্টা (মোসাম্বি) ও খেজুরসহ বিভিন্ন আমদানিনির্ভর ফলের চাহিদা ও আমদানির ওপর নির্ভরতা কমছে।