শিরোনাম

রাজবাড়ী, ১১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : রাজবাড়ী জেলার সর্ববৃহৎ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ২৫০শয্যা বিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল। দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালে তীব্র চিকিৎসক ও জনবল সংকটে হাসপাতালটি নিজেই এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশেষ করে মেডিসিন,কার্ডিওলজি, সার্জারি, শিশু, গাইনি, চর্ম ও যৌন, ফরেনসিক মেডিসিন, অর্থপেডিক, সার্জারি,ইএনটি,এনেসথেসিয়া, জুনিয়র বিশেষজ্ঞ সার্জারি, মেডিকেল অফিসার, জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার, রেডিওলজিস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকায় জেলার লাখো মানুষ কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল সুপারিন্টেনডেন্ট (তত্ত্বাবধায়ক) ডা. মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বাসস’কে জানান, ২৫০ বেডের হাসপাতালে ৫৭ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা। অনুমোদিত পদের বিপরীতে অধিকাংশ চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে জনবল সংকট রয়েছে।
জুনিয়র বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল অফিসার, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ও রেডিওলজিস্ট পদেও একই চিত্র।
বর্তমানে এসব গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরির বিপরীতে সম্প্রতি ১৬ জন মেডিকেল অফিসারের পদায়ন করা হয়েছে। কিন্তু পদায়নকৃত নতুন কোনো চিকিৎসক এই পর্যন্ত কাজে যোগদান করেননি। ফলে পূর্বের হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসক দিয়েই প্রচ- রোগীর চাপ সামলাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শত শত রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে সদর হাসপাতালে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে জটিল রোগের রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে ফরিদপুর, ঢাকা কিংবা অন্যান্য বড় হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।
শুধু চিকিৎসক সংকটই নয়, হাসপাতালটিতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারির ও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ওয়ার্ড বয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নাইট গার্ডের একাধিক পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা বাসস’কে জানিয়েছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের একজন ইমদাদুল হক বাসস’কে জানান, শিশু ওয়ার্ডে কীভাবে শিশু ও শিশুর মাকে রেখে বাড়িতে যাব? আকলিমা (৬৮)জানা, ৭ দিন ধরে হাসপাতালে আছি। আমার ছেলে এখনও সুস্থ হয়নি। ডায়রিয়া ওয়ার্ড, শিশু ওয়ার্ড, এবং গাইনি ওয়ার্ডের চিত্র আরো খারাপ।
আউটডোরে দাঁতের রোগীরা সব চিকিৎসা এখানে পান না। চক্ষু রোগীরা ভোগান্তি চলছে, চর্ম ও যৌন রোগীরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও অনেক সময় কাক্সিক্ষত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। একজন চিকিৎসককে একসঙ্গে অনেক রোগী দেখতে হয়। যার কারণে সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগিরা।
জেলা স্বাস্থ্যসেবার প্রধান রাজবাড়ীর জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ বাসস’কে বলেছেন, রাজবাড়ী জেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার প্রধান ভরসা রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকের পদগুলো বছরের পর বছর শূন্য থাকায় হাসপাতালের সক্ষমতা অনুযায়ী সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না।
এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
তিনি জানান, জরুরি মুহুতে অ্যাম্বুলেন্স করে রোগি পাঠানোর ব্যাবস্থায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে ৪টি সচল অ্যাম্বুলেন্স আছে কিন্তু চালক মাত্র একজন। তাও আবার তিনি শীঘ্রই এলপিআর এ যাচ্ছেন।
অলস অবস্থায় ২টি এক্সরে মেশিন পড়ে রয়েছে। নতুন একটি ডিজিটাল এক্সরে মেশিনের জন্য একজন টেকনিসিয়ান আছেন। হাসপাতাল সেবা কমিটির সভাপতি এবং রাজবাড়ী -১ আসনের এমপি ও এবং সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম সম্প্রতি হাসপাতালের ব্যাবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে এক সভায় বলেছেন, হাসপাতালের চিকিৎসকদের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। জেলার স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করার নির্দেশ দেন তিনি। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন বলে সভাকে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্প্রতি ১৬ জন মেডিকেল অফিসারকে পদায়ন করা হলেও তারা এখনো কাজে যোগদান করেননি বলে জানা গেছে।
প্রতিমন্ত্রী সভায় বলেছেন, বর্তমান বিএনপি সরকার জনগণের সরকার। চিকিৎসাসেবা জনগণের দৌড়গড়ায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের।
এ লক্ষ্যেই আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১শ’ বেডের হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরিত করেছে। শিগগির বাকি সমস্যাগুলোও সমাধান করা হবে।
স্থানীয় নাগরিক কমিটির সভাপতি জ্যোতিষ কুমার ঝন্টু বাসস’কে জানান, আমরা মন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, সমাজের মানুষের ‘নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায়’, সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণের বাইরে সেবা পাবার যাদের কোনো সুযোগ নেই, তারা হয় সেবা না হয় বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে মৃত্যু হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
জেলার সচেতন মহল এবং সচেতন নাগরিক কমিটি রাজবাড়ী সদর উপজেলার একটি মাত্র চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে অবিলম্বে চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মচারীর শূন্য পদ পূরণে কার্যকর ব্যাবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে।