শিরোনাম

খুলনা, ২৩ মার্চ ২০২৬ (বাসস) : পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ভাগাভাগিতে ব্যস্ত নগরবাসী, তখন খুলনায় শত শত পুলিশ সদস্য রাজপথে দায়িত্ব পালন করেই উদযাপন করেছেন তাদের ঈদ। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ঈদের আনন্দ-উৎসব উদযাপন করছে খুলনার পুলিশ।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) বয়রা পুলিশ লাইনে কর্মরত কনস্টেবল মো. সুলতান-ই-আলম নগরীর ব্যস্ততম শিববাড়ি মোড়ে দায়িত্ব পালন করছেন। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ি গ্রামের এই পুলিশ সদস্য তিন কন্যা সন্তানের জনক। ঈদের দিনেও পরিবারের কাছে না গিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন রাজপথে।
তিনি বলেন, সবার ঈদ-ই আমাদের ঈদ। আমরা যদি পরিবারে ফিরে যাই, তাহলে শহরের নিরাপত্তা দেবে কে? প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব প্রসঙ্গে তিনি জানান, পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে না পারার কষ্ট থাকলেও দায়িত্ব পালনের তৃপ্তিই বড়।
শুধু সুলতান-ই-আলম নন, তার মতো খুলনায় শত শত পুলিশ সদস্য ঈদের ছুটিতে পরিবার ছেড়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের কাছে ঈদের আনন্দ মানে মানুষের নিরাপদ উদযাপন নিশ্চিত করা। অনেকেই ঈদের দিন ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত টানা দায়িত্ব পালন করেছেন। ঈদগাহে নামাজ আদায় না করে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন তারা।
এবারের ঈদে নিরাপত্তা বজায় রাখতে গিয়ে কেএমপির অধিকাংশ পুলিশ সদস্য ছুটি পাননি। তাদের ঈদ কাটছে স্বজনহীন কর্মব্যস্ততায়। পুলিশ সদস্যদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। অনেকেই বছরের পর বছর ঈদ করেন থানায়, ব্যারাকে কিংবা রাস্তায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। আর ভিডিও কলে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেই কাটে ঈদের আনন্দ।
ঈদের দিন শনিবার খুলনার বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যদের।
কেএমপির ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত পুলিশ সদস্য আব্দুল কাদেরের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলা সদরে। দায়িত্ব পালন করছেন নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে। ঈদে স্বজনদের কাছে না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন ট্রাফিক বিভাগের ১০৭ জন সদস্য ছুটি পেয়েছেন, সবাই ছুটিতে গেলে সড়কে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তবে আসন্ন ঈদুল আযহায় ছুটি পাবেন বলে আশা করছেন তিনি। তখন পরিবারের সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে ঈদুল আজহা উদযাপনের আশা করছেন তিনি।
একই বিভাগের মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই আমাদের ঈদ কাটছে। তবে আগামী ঈদে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
যশোরের বাসিন্দা ট্রাফিক সদস্য তৌহিদুজ্জামান জানান, ঈদের সময় সড়কে চাপ বেড়ে যাওয়ায় দায়িত্বও বেড়ে যায়। জনবল সীমিত হওয়ায় পালাক্রমে ছুটি দেওয়া হয়। যারা এবার ছুটি পাননি, তারা পরবর্তী ঈদে ছুটি পাবেন।
পুলিশ সদস্য মো. আসলাম বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কারণে অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা সম্ভব হয় না। তবুও জনগণের নিরাপত্তাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
অপরদিকে, খুলনার রূপসা কিসমত খুলনা ফাঁড়িতে কর্মরত পুলিশ সদস্য সাতক্ষীরার জাহিদুর রহমান বলেন, জনগণের নিরাপত্তার জন্য অনেক সময় পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন করা হয় না। তারপরও মেনে নিতে হবে, কারণ এটাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
রূপসা থানায় কর্মরত এ এসআই মো. জাকির হোসেনের গ্রামের বাড়ি যশোরের অভয়নগর। তিনি বলেন, পুলিশে চাকরি করি। ঈদে পরিবারের সাথে আনন্দ উপভোগ করতে চাইলেও অনেক সময় সম্ভব হয়না। তারপরেও জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা এই ত্যাগ স্বীকার করে আসছি। ‘ঈদে পরিবারের কাছে যেতে না পারলেও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।’ এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও ত্যাগ।
একই সুরে রূপসা কিসমত খুলনা ফাঁড়ির এএসআই ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এলাকার মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় স্ত্রী, সন্তান বাড়ি রেখে পুলিশের চাকরি করে আসছি। ঈদের আনন্দকে ত্যাগ করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করাই আমাদের কাজ। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই ত্যাগ স্বীকার করা।
রূপসা বাসস্ট্যান্ড ফাঁড়ির আইসি চুয়াডাঙ্গার জেলার মো. আকরামুল হক বলেন, পুলিশের দায়িত্বের খাতিরে সকল ঈদে পরিবারের কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে এবং জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা এই ধরনের ত্যাগ স্বীকার করে আসছি। পরিবারের সাথে ঈদ করা যেমন প্রয়োজন, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থটাও তেমন প্রয়োজন। তবে এই ঈদে ছুটি না কাটালেও কোরবানির ঈদে ছুটি নিয়ে পরিবারের সাথে ঈদ করবো বলে জানান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে নগরীর বিভিন্ন ঈদগাহ, মসজিদ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সড়কে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঈদ পরবর্তী সময়েও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
কেএমপির উদ্যোগে ডিউটির ফাঁকে সদস্যদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন ও সহকর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নিজেদের পারিবারিক আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পুলিশ সদস্যদের এই ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের ফলেই দেশের অধিকাংশ মানুষ নির্বিঘ্নে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারছেন-যা পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।