বাসস
  ১৮ আগস্ট ২০২৬, ২৩:০৪

ফ্যাসিস্টের বদলে ফেলা নাম ফিরে পেল চট্টগ্রামের ‘মিনি বাংলাদেশ’

ছবি : সংগৃহীত

আবু মোশাররফ

চট্টগ্রাম, ১৮ আগস্ট ২০২৬ (বাসস) : ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারে বদলে ফেলা চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ অবশেষে নিজের নাম ফিরে পেয়েছে। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি জোট সরকারের আমলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কয়েক বছর পর সেটির নাম বদলে রাখা হয়েছিল ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৬ জুন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আযম খান চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনকালে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সময়ে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’ করা হয়েছিল; যা প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আবার এর নাম ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ করা হবে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমপ্লেক্সটির নতুন নাম ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ পুনর্নির্ধারণ করেছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘চট্টগ্রাম জেলার ঐতিহাসিক কালুরঘাটস্থ ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’টি (চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ উপজেলাধীন চাঁনগাঁও মৌজার জেএল নম্বর-০৯, বিএস খতিয়ান নম্বর-০৩, দাগ নম্বর-১১৮৩৮, জমির পরিমাণ- ১৬ দশমিক ৩৭ একর) এখন থেকে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নামে অভিহিত হবে।’

এর আগে, গত ২৪ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র এবং শহীদ জিয়ার স্মৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানিয়েছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ এরশাদ উল্লাহ আজ বাসসকে বলেন, ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স-এর নাম পুনর্বহালের জন্য আমরা মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। তার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তন করেছে। এই জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই, মন্ত্রী মহোদয় এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাই।’ 

তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিধন্য কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের পাশে পরিত্যক্ত জায়গায় তৎকালীন বিএনপির সরকার এই কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছিল। এখানে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী সব স্থাপনার রেপ্লিকা করা হয়েছিল, চট্টগ্রামের মানুষের জন্য এটি একটি চমৎকার বিনোদন কেন্দ্রও। কিন্তু গত বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলার যে ষড়যন্ত্র করেছিল, সেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে এটির নাম বদলে স্বাধীনতার কমপ্লেক্স রেখেছিল।’ 

এরশাদ উল্লাহ এমপি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই এটিকে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ হিসেবে চেনে-জানে। বিগত সরকার নাম পরিবর্তন করলেও স্থানীয় মানুষজন কখনোই ওই নামে এটিকে চেনেনি, তারা জিয়া কমপ্লেক্স নামেই এটিকে অভিহিত করে আসছে সব সময়।’

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিন পর্যন্ত পার্কটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনা করছিল তখনকার আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের একজন সংসদ সদস্যের ভাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। সরকার পতনের পর ওই দিন রাতে শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ পার্কে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়। এরপর থেকে পার্কটি আর খুলে দেওয়া হয়নি। 

চট্টগ্রামে ‘মিনি বাংলাদেশ’ :

চট্টগ্রামের মহানগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বিপরীতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রসংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১৬ দশমিক ৩৭ একর পরিত্যক্ত জায়গায় ২০০৬ সালে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কমপ্লেক্সটি ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

দেশের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে এক নজরে দর্শনীয় করার লক্ষ্যে জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সে নির্মাণ করা হয়েছিল ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল, লালবাগ কেল্লা, কান্তজিউ মন্দির, বড় কুঠি, ছোট সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার উল্লেখযোগ্য। 

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের স্মরণে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি রিভলভিং বা ঘূর্ণায়মান টাওয়ার; যেটির উপরে রয়েছে রেস্টুরেন্ট। টাওয়ারটির উচ্চতা ৭১ মিটার এবং ব্যাস ৫২ মিটার। বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে এই পার্কে একসঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার বিষয়ে জানার সুযোগ পেতেন দর্শনার্থীরা। ফলে এটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

পার্কটি নির্মাণের চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণ-পরবর্তী সময়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত পরিচালনা করেছিল কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্ট গ্রুপ। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কমপ্লেক্সটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে মেয়াদ শেষ হলে চসিক নতুন করে ইজারা নিতে আগ্রহ দেখায়নি। পরে একই বছরের নভেম্বরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কমপ্লেক্সটির ইজারা নেয়। সে সময় পার্কে প্রবেশের মূল্য ১৫০ টাকা করা হয়। সর্বশেষ ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালক নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর ভাই। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ইজারার চুক্তি শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।