বাসস
  ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৪০

চবিতে আবাসিক হল থেকে টিএসসি নির্মাণ: মাস্টারপ্ল্যানে ৭২৭ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব

রেদ্ওয়ান আহমদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৫০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় একাডেমিক, অবকাঠামো ও গবেষণা সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৭২৭ কোটি টাকার দু’টি বড় প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। 

এর মধ্যে ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকার ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে। আর ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকার ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচার-স্টুডেন্টস কমপ্লেক্স (টিএসসি) প্রতিষ্ঠাকরণ’ প্রকল্পটি জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আলতাফ-উল-আলম এ তথ্য জানিয়েছেন।

গত ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দু’টি প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ৭২৭ কোটি ৪৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।

এর মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রায় ৮২ কোটি ৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। তবে এই অর্থ পুরো প্রকল্পের ব্যয় নয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, প্রকল্প দু’টি আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পটির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, গবেষণা অবকাঠামো, আবাসিক সুবিধা এবং ক্যাম্পাসের মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন কয়েকটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ। এর মধ্যে ২য় বিজ্ঞান অনুষদ ভবন ও ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ ভবন নির্মাণে প্রস্তাবিত ব্যয় ১৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। একই পরিমাণ ১৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা রাখা হয়েছে ২য় সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের জন্য। ২য় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবন নির্মাণে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৩ কোটি ৫৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

এছাড়া ছাত্রীদের জন্য একটি ১০ তলা বিশিষ্ট আবাসিক হল নির্মাণে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা, ১০ তলা প্রশাসনিক (এনেক্স) ও সিনেট ভবন নির্মাণে ৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ছাত্রীদের হল প্রভোস্ট ও হাউস টিউটরদের জন্য ৫ তলা বিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবন নির্মাণে ৮ কোটি ৯৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়া মাস্টারদা সূর্যসেন হলের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের (২ তলা) জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

গবেষণা সক্ষমতা বাড়াতেও রয়েছে বড় বিনিয়োগ। বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্র ও বিশেষায়িত অবকাঠামো নির্মাণে ৪৯ কোটি ২৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৯ তলা বিশিষ্ট একটি সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ভবন এবং ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৫ তলা বিশিষ্ট একটি সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক এন্ড এডভান্সড বায়োলজিকাল রিসার্চ ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পাশাপাশি ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি কেনায় ১২ কোটি টাকা এবং রাসায়নিক সংগ্রহে ১০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও জীববিজ্ঞান অনুষদের গবেষণার জন্য অ্যানিমেল হাউস নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

প্রকল্পে একাডেমিক ভবনের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের মৌলিক অবকাঠামোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ ও প্রশস্তকরণে ১৬ কোটি ৫১ লাখ হাজার টাকা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন স্থাপনে ২১ কোটি ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, পানি সরবরাহ লাইন সংস্থাপনে ২ কোটি ২৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা, গ্যাস পাইপলাইন সংস্থাপনে ১ কোটি ২৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা এবং ভূগর্ভস্থ পানি রিজার্ভার নির্মাণে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ২৪ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি এসটিপি ও প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য ইউটিলিটি অবকাঠামোর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে বাকি টাকা।

তবে এই ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ টাকার প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আলতাফ-উল-আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে।

অন্যদিকে, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচার-স্টুডেন্টস কমপ্লেক্স (টিএসসি) প্রতিষ্ঠাকরণ’ প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, পাঠ ও গবেষণার পরিবেশ, প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক ও কো-কারিকুলার কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে এ প্রকল্পে।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় টিএসসি নির্মাণে। পাঁচ তলা ভিত্তির ওপর চার তলা ভবন নির্মাণে প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এর বাইরে কনসালটেন্সি, বইপত্র ও সাময়িকী, আসবাবপত্র, অফিস সরঞ্জাম, প্রচার-প্রকাশনা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের জন্য ধরা হয়েছে বাকি ২ কোটি ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।

চবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, টিএসসি প্রকল্পটি চবি থেকে প্রস্তাবিত হয়ে ইউজিসিতে যায়। ইউজিসির অনুমোদনের পর এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটি বর্তমানে জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটি প্রজেক্ট ইভ্যালুয়েশন কমিটির (পিইসি) মাধ্যমে একনেকের অনুমোদনের জন্য যাবে। একনেকের অনুমোদনের পরই এর জন্য সরকারি বাজেট বরাদ্দের পথ খুলবে।

প্রায় ৭২৭ কোটি টাকার দু’টি প্রকল্পের পরিকল্পনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত রূপান্তরের বড় চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে নতুন অনুষদ ভবন, আবাসিক হল, গবেষণা কেন্দ্র ও ইউটিলিটি অবকাঠামো, অন্যদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য টিএসসি—সব মিলিয়ে বদলে যেতে পারে চবি ক্যাম্পাসের অবকাঠামোগত চিত্র।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, ‘অতিশীঘ্রই উক্ত দু’টি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের বিষয়ে আমি আশাবাদী এবং এই বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদ্বয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি। উক্ত দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত, একাডেমিক এবং গবেষণা প্রতিবন্ধকতাসমূহ বহুলাংশে নিরসন হবে।’

শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আরও কিছু প্রকল্প প্রস্তাব ইউজিসিতে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান।

উপাচার্য বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অতি সম্প্রতি প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ ধরে একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব ইউজিসিতে পাঠানো হবে।’

এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাত্রদের জন্য ৫টি এবং ছাত্রীদের জন্য ৫টি করে (প্রতিটি ১০ তলা বিশিষ্ট) আবাসিক হল নির্মাণ, বিদেশী শিক্ষার্থী ও পিএইচডি-এমফিল গবেষকদের জন্য ১টি হল নির্মাণ, ৪টি ১০ তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ব্লু-ইকোনমি রিসার্চ সেন্টার নির্মাণ, কেন্দ্রীয় জাদুঘর ভবন নির্মাণ, গ্রন্থাগারের ২য় ভবন নির্মাণ।

এছাড়া রয়েছে স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুল নির্মাণ, রসায়ন বিভাগের এডভান্সড রিসার্চ ল্যাব নির্মাণ, এডভান্সড রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্স ভবন নির্মাণ, মডার্ণ ল্যাংগুয়েজ ভবন নির্মাণ, জৈব প্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল ইনস্টিটিউট (জিনোম সিক্যুয়েন্সিং এবং রেফারেল সেন্টারসহ) ভবন নির্মাণ।

শুধু তা-ই নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবনাও রয়েছে সেখানে। পাশাপাশি ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণ, কয়েকটি বহুতল অফিস ভবন নির্মাণ, টিচার্স ডরমেটরি ভবন নির্মাণ, সোলার লাইটিংসহ ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ফুড কোর্ট ও ওয়েট মার্কেট নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।