শিরোনাম

শরীয়তপুর, ২৩ জুন, ২০২৬ (বাসস) : অদম্য ইচ্ছা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা পেলে যে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, তা প্রমাণ করেছেন শরীয়তপুরের সফল নারী উদ্যোক্তা তানিয়া বেগম।
স্বামীর অনুপ্রেরণা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন এসডিএস-এর সহযোগিতায় তিনি এখন স্বাবলম্বী।
শরীয়তপুর পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের তুলাসার গ্রামের বাসিন্দা তানিয়া বেগম (৩৫)। পেশায় তিনি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পারিবারিক সহযোগিতা এবং আর্থিক সংকটে লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষিত হতে না পারলেও স্বামীর অনুপ্রেরণায় এবং স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি সংগঠন এসডিএস-এর সহযোগিতায় তানিয়া নিজকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
স্বামী, এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে ৪ সদস্যের সংসার তানিয়া বেগমের। ছেলে স্থানীয় একটি স্কুলে দশম শ্রেণিতে এবং মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। তানিয়ার স্বামী আকবর আলী (৪২) ঢাকার একটি সার্জিক্যাল পণ্য তৈরির কারখানায় চাকরি করতেন। সেখানে তিনি সার্জিক্যাল পণ্য তৈরি ও বিক্রয়ের কাজ করতেন। কিন্তু চাকরির সামান্য বেতনে তার সংসার ঠিকঠাক চলছিল না। তাই ২০১৮ সালের শেষের দিকে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজ এলাকা শরীয়তপুরে সার্জিক্যাল পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেন।
প্রথমে তিনি একটি সেলাই মেশিন দিয়ে নিজ বাড়িতে সার্জিক্যাল বেল্ট উৎপাদন শুরু করেন। তার এ কাজে সার্বক্ষণিক সহায়তা করেন স্ত্রী তানিয়া বেগম। এভাবেই স্বামীকে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে তানিয়া নিজে বেল্ট তৈরির কাজ শিখে ফেলেন। আর সেখান থেকেই ব্যবসার হাতে খড়ি তানিয়া বেগমের।
তানিয়ার স্বামী আকবর আলী মাপ ও ডিজাইন মোতাবেক কাপড় কেটে দিতেন। মাপ ও ডিজাইন করা কাপড় তানিয়া সেলাই মেশিনে সেলাই করে বেল্ট তৈরি করতেন। তার উৎপাদিত পণ্য স্বামী আকবর আলী স্থানীয় বাজারে ঘুরে-ঘুড়ে বিক্রি করতেন এবং নতুন অর্ডার সংগ্রহ করতেন। এভাবে স্বামী-স্ত্রীর কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় দিনে দিনে তাদের উৎপাদিত সার্জিক্যাল বেল্ট উৎপাদন ও ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হলে তাদের ব্যবসায়ও ভাটা পড়ে।
এতে করে আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখী হন তানিয়া বেগম। ওই সময় তিনি গৃহবন্দী থাকায় ব্যবসার পুঁজি ভেঙ্গে সংসারে খরচ চালাতে গিয়ে চরম অভাব অনটনে পড়েন। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুঁজির অভাবে ব্যবসা শুরু করতে বাধার সম্মুখীন হন। এমন অবস্থায় তিনি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসডিএস এর রেইজ প্রকল্প থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করে পুনরায় ব্যবসা শুরু করেন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
সেই সাথে তিনি রেইস প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনায় ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিভাবে ব্যবসার ঝুঁকি মোকাবেলা করা এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কি ভাবে উন্নতি করা যায় সে বিষয়ে ধারণা লাভ করেন।
ওই সময় ব্যবসার টাকা দিয়ে সাংসারিক খরচ মিটিয়ে তিনি প্রতি মাসে কিছু টাকা জমাতে শুরু করেন এবং অনলাইনে একটি পেজ খুলে সারাদেশে তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি শুরু করেন। সপ্তাহে একদিন তানিয়া বেগম ও তার স্বামী আকবর আলী বিভিন্ন ফার্মেসি, দোকানে অনলাইনে ও সরাসরি যোগাযোগ করে অর্ডার সংগ্রহ করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে ঘুরে দাঁড়ান। স্বামী-স্ত্রী মিলে সার্জিক্যাল বেল্ট তৈরির পাশাপাশি শরীয়তপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান চৌরঙ্গীতে একটি ‘তানিয়া সার্জিক্যাল বেল্ট সেন্টার’ নামে একটি দোকান খোলেন।
এক সময়ের দুঃখ কষ্টে জর্জরিত তানিয়া বেগমের সার্জিক্যাল দোকানে এখন প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেট আয় হচ্ছে। তার প্রতিষ্ঠানে ৬ জন লোক কাজ করে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করছেন।
তানিয়ার উৎপাদিত সার্জিক্যাল বেল্টসহ অন্যান্য সার্জিক্যাল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে শরীয়তপুরের প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন ফার্মেসিতে।
এছাড়া শরীয়তপুরের বাইরেও তার উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর ও সুদূর রংপুর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
তানিয়ার উৎপাদিত পণ্য সম্পর্কে শরীয়তপুরের অন্যতম খান ফার্মেসির প্রোপাইটার আব্দুর রহমান বলেন, তানিয়ার উৎপাদিত সার্জিক্যাল বেল্টসহ অন্যান্য সার্জিক্যাল সামগ্রীর চাহিদা ব্যাপক। এর মান বাজারের অন্যান্য নামিদামি কোম্পানির চাইতে অনেক বেশি। সহযোগিতা পেলে তানিয়ার উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী দেশের ব্রান্ড হয়ে উঠতে পারে।
রংপুরের মা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী বলেন, দেশে অনেক নামিদামি ব্রান্ডের সার্জিক্যাল পণ্য থাকার পরও আমরা শুধু শরীয়তপুরের তানিয়ার কাছ থেকে সার্জিক্যাল বেল্টসহ অন্যান্য সার্জিকেল পণ্য অনলাইনে অর্ডার করে এনে বিক্রি করি। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তানিয়া বেগমের উৎপাদিত সার্জিক্যাল বেল্ট ও অন্যান্য সার্জিকেল পণ্যের মান ভালো হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা অনেক বেশি।
মাদারীপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার, গাইনি ডাক্তার নাজিয়া আক্তার বলেন, তানিয়ার উৎপাদিত সার্জিক্যাল বেল্ট ও অন্যান্য সার্জিক্যাল সামগ্রী অত্যন্ত ভালো মানের। আমি এসব পণ্য রোগীদের ব্যবহার করার নির্দেশনা দিয়ে থাকি। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে তানিয়ার এ পণ্যের বাজার আরও বড় হবে।
জীবন যুদ্ধে সফল এক সংগ্রামী নারী তানিয়া এখানেই থেমে থাকতে রাজি নন। ভবিষ্যতে তিনি ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারিত করতে চান এবং দেশের উল্লেখযোগ্য একজন সফল উদ্যোক্তা নারী হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে শোরুম খুলে অবহেলিত নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চান।