বাসস
  ১২ জুন ২০২৬, ১৯:৫৪
আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ২১:০৪

জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হচ্ছে : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ছবি : বাসস

ঢাকা, ১২ জুন, ২০২৬ (বাসস) : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের আমদানি নির্ভরতা কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) আরও সক্রিয় ও সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছরে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পর্যাপ্তভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়নি। সমুদ্রসীমা বিজয়ের পরও সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান হয়নি।

দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতের এই বাস্তবতা পর্যালোচনা করে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, বাপেক্সের জন্য আরও পাঁচটি রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন কূপ খনন ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা যায়। এছাড়া সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানে বাপেক্সের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে অফশোর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এক মাস পর দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হলে নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ব্লকগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে।

জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান কিছু জ্বালানি চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে তেল আমদানি করেছে। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে এবং তেলের সরবরাহে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি।

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তির কারণে সরকারকে একদিকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের কাছে কম দামে সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে সৃষ্ট ভর্তুকির বোঝা অর্থ মন্ত্রণালয়কে বহন করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধের দায়ভার নিতে হয়েছে। পাশাপাশি চলমান বিলও পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তবে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী এই সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে সরকার উৎসাহ দিচ্ছে।

মন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ‘স্পিনিং মার্জিন’ সংরক্ষণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে এসব পদক্ষেপের ইতিবাচক ফলাফল দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।

বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো.সাখাওয়াত হোসেন, কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার , জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর  মো. মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার।