বাসস
  ১১ জুন ২০২৬, ১৭:১১

দিনাজপুরে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ব্যবহারে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষে সফল কৃষক

ছবি : বাসস

 রোস্তম আলী মন্ডল 

দিনাজপুর, ১১ জুন ২০২৬ (বাসস) : কৃষি বিভাগের গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও সহযোগিতায় গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষে সফল হয়েছেন দিনাজপুরের কৃষক মো. ওয়াবাইদুল ইসলাম।

ফুলকপি মানেই শীতকাল। এমন ধারণা এখন বদলে দিচ্ছেন দিনাজপুরের কৃষকরা। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এবার গ্রীষ্মকালেও সফলভাবে ফুলকপি চাষ করে নতুন সম্ভাবনা দুয়ার উন্মোচন করেছেন চাষিরা। রবি মৌসুমের বাইরে উৎপাদিত এসব সবজিতে মিলছে ভালো দাম। তাই লাভবান হচ্ছেন অসময়ে সবজি চাষি কৃষকরা।

আজ দুপুরে দিনাজপুর সদর উপজেলার উত্তর মহেশপুর গ্রামের কৃষক ওবায়দুল ইসলামের গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি পরিদর্শন করেছেন দিনাজপুর কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত আঞ্চলিক পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ সাদেক। 

তিনি বলেন, ‘আমি অভিভূত। অসময়ে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষে একজন কৃষক ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছেন। আমরা এই ধারাবাহিকতা চলমান রাখতে চাই। আগামী বছর খাদ্যের জেলা হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরের ১৩ টি উপজেলাতে এ ধরনের গ্রীষ্মকালীন ফুলকপিসহ সব ধরনের সবজি চাষে কৃষকদের নিয়ে এগিয়ে যাবো। এজন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা  দেওয়া হবে।  

দিনাজপুর সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের উত্তর মহেশপুর গ্রামের কৃষক মো. ওবায়দুল ইসলাম এবার গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। খরিপ-১ মৌসুমে মাত্র ৩৩ শতক জমিতে ‘আইসবল’ জাতের প্রায় ৫ হাজার ফুলকপির চারা রোপণ করেন তিনি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচর্যার ফলে মাত্র ৬০ দিনের মধ্যেই তার জমি ভরে উঠেছে সাদা ফুলকপিতে।

বর্তমানে তার ক্ষেত থেকেই পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে ফুলকপি ক্রয় করে  নিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ টাকার ফুলকপি বিক্রির আশা করছেন তিনি।

কৃষক ওবায়দুল ইসলাম জানান, এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে জমি প্রস্তুত করে কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিনি ফুলকপির চারা রোপণ করেন। খেতে ফেরোমন ফাঁদ, আঠা ফাঁদ ও লাইট ট্র্যাপ ব্যবহার করে নিরাপদ উপায়ে পোকামাকড় দমন করা হয়েছে। পাশাপাশি জৈব সার ও পরিমিত বালাইনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে সবজির গুণগত মান বজায় রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মাত্র দুই মাসের মধ্যেই ফুলকপি বাজারজাত করা সম্ভব হয়েছে। ৩৩ শতক জমিতে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা মুনাফা অর্জন করতে পারবো বলে আশা করি। বাজারে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে হারভেস্টিং শুরু করেছি। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ করবো।’

ওবায়দুল ইসলামের সফলতা দেখে আশপাশের কৃষকরা গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তার প্রতিবেশি কৃষক মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘গরমের সময় ফুলকপি চাষ সম্ভব, এটা আগে কল্পনাও করিনি। ওবায়দুল ইসলামের ক্ষেতের ফুলকপির ফলন দেখে আমি অবাক হয়েছি। আগামী বছর অন্তত এক একর জমিতে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষের পরিকল্পনা করছি।’

একই গ্রামের কৃষক অজয়চন্দ্র রায় বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষে উঁচু জমি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা থেকে ফসল রক্ষা করতে হয়। আমি গত বছর ২০ শতক জমিতে এই ফুলকপি চাষ করে ভালো লাভ পেয়েছিলাম। এবার ৩০ শতক জমিতে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ করেছি এবং ভালো ফলন ও অধিক দামে অর্জিত ফুলকপি বাজারে বিক্রি করছি। আশা করছি আমার জমিতে অর্জিত ফুলকপি এবারে এক লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারবো।

আরেক কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘অন্যান্য সবজির দাম কমে গেলেও গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির বাজার মূল্য ভালো থাকে। ফলে কৃষকরা দ্রুত লাভবান হতে পারেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হলে এই গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়বে।’

দিনাজপুর সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন বলেন, টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির চাষ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, চারা, সার ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ সবজি উৎপাদনের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দিয়ে, আধুনিক এই প্রদ্ধতির গ্রীষ্ম কালীন সবজি ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি করার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ এখন দিনাজপুর অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অল্প সময়ে অধিক লাভ পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে ভোক্তারা মৌসুমের বাইরে তাজা ফুলকপি পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন।’

দিনাজপুর অঞ্চলের উন্নত জাত উদ্ভাবন ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ মো. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপির চাষ পরিচিত করা হয়। শুরুতে কৃষকেরা সীমিত আকারে এক থেকে দুই বিঘা জমিতে এই চাষ করেছিলেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি চাষ সফল হয়েছে। এটা কৃষি বিভাগের একটি বড় সফলতা বলে আমি মনে করছি।

তিনি বলেন, ‘বাজারে চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। যদিও এই মৌসুমে অতিবৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির মতো নানা চ্যালেঞ্জ কৃষকদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। তার পরও কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন ও পরিচর্যার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে দিন দিন এই চাষের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে।  কৃষকেরাও অধিক ফলন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন ।