বাসস
  ০৬ জুন ২০২৬, ১৬:২১

৫০০ টাকার পুঁজিতে ভাগ্য বদল রাজবাড়ীর জাহিদের

ছবি : সংগৃহীত

॥ মোশারফ হোসেন ॥

রাজবাড়ী, ৬ জুন, ২০২৬ (বাসস): তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে যেখানে মানুষ হতাশায় ভেঙে পড়েন, সেখান থেকে যদি কারো যাত্রা শুরু হয়, তাও মাত্র ৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের ভাগ্য বদলের চেষ্টা। এমন একজন সফল উদ্যোক্তা হলেন রাজবাড়ীর অদম্য যুবক জাহিদ হাসান ওরফে তপু। 

জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ভীমনগরে তার বাড়ি। গ্রামের এই তরুণ সফল উদ্যোক্তা আজ নিজ জেলা ছাড়িয়ে অন্য জেলাতেও তার সফলতার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি একজন অনুকরণীয় কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম আর সঠিক দূরদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে জাহিদ আজ সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেছেন।

পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে শৈশবেই জাহিদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আঙিনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পড়াশোনা থেমে গেলেও তাঁর ভেতরের স্বপ্ন ও অদম্য ইচ্ছা শক্তি কেউ দমাতে পারেনি।

জানা যায়, ২০১০ সালে কোনো উপায় না দেখে জাহিদ মায়ের কাছ থেকে মাত্র ৫০০ টাকা নিয়ে ছোট পরিসরে একটি ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই ব্যবসার লভ্যাংশ এবং আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার নেয়া মাত্র ৮ হাজার টাকা পুঁজিতে শুরু করেন ব্রয়লার মুরগির খামার। প্রথমবারেই তিনি সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩৩ হাজার টাকা মুনাফা অর্জন করেন। এই প্রথম সাফল্যই জাহিদের ভেতরের উদ্যোক্তা হবার সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলে এবং জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

২০১৪ সালে বালিয়াকান্দি সদরে উপজেলা কার্যালয়ের পাশে জাহিদ একটি কসমেটিকস ও ফুলের দোকান দেন। ব্যবসা চলাকালীন তিনি বুঝতে পারেন যে, স্থানীয় বাজারে ফুলের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে ফুল আমদানি করতে গিয়ে পরিবহন খরচ যেমন বেড়ে যায়, তেমনই অনেক ফুল নষ্ট হয়ে যায়। তাই এ সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে জাহিদ নিজেই ফুল চাষের ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। নিজের কোনো চাষযোগ্য জমি না থাকায় তিনি ২০১৮ সালে অন্যের জমি লিজ বা বর্গা নেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে আধুনিক কৃষি ও খামার ব্যবস্থাপনার ওপর স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি বাণিজ্যিকভাবে গাঁদা, রজনীগন্ধা ও গোলাপের চাষ শুরু করেন।

ফুল চাষের পাশাপাশি তিনি ডেইরি ও পশুপালনের দিকেও নজর দেন। মাত্র দুটি ‘হরিয়ানা’ জাতের ছাগল কিনে জাহিদ গড়ে তোলেন একটি সমন্বিত গবাদিপশুর খামার। বিজ্ঞানসম্মত লালন-পালন ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে অল্প দিনেই তাঁর খামারে ছাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। জাহিদের এই বহুমুখী কৃষি ও খামার প্রকল্প স্থানীয় বেকার যুবকদের মাঝেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বর্তমানে জাহিদের এই কৃষি খামার অনেক বড় পরিধি লাভ করেছে। তাঁর উৎপাদিত ফুল এখন শুধু রাজবাড়ী নয়, পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর, মাগুরা ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে।

বর্তমানে জাহিদ প্রায় ১০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে উচ্চ ফলনশীল ধান ও বিভিন্ন জাতের শীতকালীন সবজি চাষ করছেন। একই সঙ্গে জলাশয়ে করছেন মিশ্র মাছের চাষ।

শূন্য থেকে শুরু করে কোটি টাকার টার্নওভারের এই অবস্থানে পৌঁছানো জাহিদ হাসান গতকাল শুক্রবার বাসসকে বলেন, ‘শুরুর দিনগুলো অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ছিল। মূলধন না থাকা এবং সামাজিক নানামুখী প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমি হাল ছাড়িনি। আমার বিশ্বাস ছিল, সততা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। দেশের বেকার যুবকদের উদ্দেশ্যে আমার পরামর্শ হলো—চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়া উচিত। এতে নিজের পাশাপাশি সমাজের আরও ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।’

তিনি বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমি হয়তো আর একটু এগুতে পারতাম।
স্থানীয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রতন কুমার ঘোষ জাহিদের এই অভাবনীয় সাফল্যকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি গতকাল শুক্রবার বাসসকে বলেন, জাহিদ হাসান তপু রাজবাড়ী জেলার যুবসমাজের অহংকার। জাহিদ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করতে অনন্য ভূমিকা পালন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে আমাদের প্রতিটি গ্রামেই এমন হাজারো জাহিদ তৈরি হওয়া সম্ভব, যারা তাদের মেধা দিয়ে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করতে অনন্য ভূমিকা পালন করবেন।