শিরোনাম

আল-আমিন শাহরিয়ার
ভোলা, ১ মে, ২০২৬ (বাসস) : জেলায় ইলিশের প্রজনন, জাটকা সংরক্ষণসহ মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের বেঁধে দেয়া ২ মাসের নিষেধাজ্ঞা গতকাল বৃহস্পতিবার দিনগত মধ্যরাতে শেষে হয়েছে। আর তাই বৃহস্পতিবার রাত ১২ টার পর থেকে ভোলার নদ-নদীতে নামা জেলেদের জালে ধরা পড়ছে রুপালি ইলিশের ঝাঁক। ফলে উপকূলীয় জেলা ভোলার নদীগুলো ফের সরব হয়ে উঠেছে জেলেদের কর্মচাঞ্চল্যে।
আজ শুক্রবার থেকে পুরোদমেই মাছ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন ভোলার জেলেরা।
সরেজমিনে আজ সকালে শহরতলীর ইলিশার আড়ৎগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, জেলেরা রাতভর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ শিকার করে ঘাটে নিয়ে আসছেন। তবে আহরণের প্রথমদিন হওয়ায় ইলিশের দাম বেশ চড়া। তবুও ইলিশের স্বাদ নিতে বহু ক্রেতার কাছে বেশি মূল্য বিবেচ্য নয়। তাই তারা রুপালী ইলিশ কিনতেই আড়ৎগুলোতে ভিড় জমিয়েছেন। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২শত টাকায়। এছাড়া প্রকারভেদে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১৫শ’ টাকা পর্যন্ত।
দীর্ঘ ৬০ দিন মাছ শিকার বন্ধ থাকায় ভোলার অধিকাংশ জেলেই সরকারি সাহায্য পেয়েছে।
তারা জানান, এবার দালালচক্রের হস্তক্ষেপ না থাকায় সঠিকভাবে সরকারের সাহায্য পেতে কোনোপ্রকার বেগ পেতে হয়নি। আজ শুক্রবার মধ্যরাত থেকে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ায় জেলেরা নদীতে নেমে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ পাচ্ছেন বলে খবর মিলেছে। অধিক মাছ পাওয়ায় জেলেরা এখন উচ্ছ্বসিত।
মেঘনার জলে ছড়ানো যে জালগুলো ২ মাস শুকনো ছিলো, জেলেরা সেই জালগুলো এখন উত্তাল নদীর জলরাশিতে ফেলে আহরণ করছেন হরেক রকমের মাছ। জেলে পরিবারের ঘরে ঘরে এখন আনন্দের শেষ নেই।
আজ সকাল ৮টায় ভোলা সদরের শিবপুর মাছঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, জেলেরা দলবেঁধে মাছ ধরতে নদীতে নামছেন। মেঘনা পাড়ের শিবপুর মাছঘাটের জেলে আব্দুর রশিদ, আবুল কালাম মাঝি ও রবিউল মাঝির সঙ্গে আলাপকালে তারা বাসস’কে বলেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা মানতে গিয়ে আমরা মাছ ধরতে ২মাস নদীতে না নামলেও কিছু অসাধু লোক নদীতে মাছ মারতে নেমে যৌথবাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। এসব জেলেরা বলেন, জেলার সব জেলেদের সরকারি সহযোগিতার আওতায় আনতে পারলে প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞা শতভাগ সফল হবে।
ভোলার ইলিশা মাছঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, ২মাস বন্ধ থাকার পর সেখানকার আড়ৎগুলো সচল হয়েছে। খুলেছে সার্টার, চলছে মাছ কেনাবেচার ধুম। মাছের আড়ৎগুলোর বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা চায়ের দোকান, মুদি দোকান আর হোটেল রেস্তোরাঁগুলোও ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনায় সরব হয়ে উঠেছে।
ভোলার আড়ৎমালিক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার বাদশা মিয়া বাসস'কে জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার দিনগত মধ্যরাত থেকে মাছ শিকার করা শুরু হওয়ায় আজ ভোর থেকে আড়ৎগুলো জেগে উঠেছে। শুরু হয়েছে সেই চিরচেনা কেনাবেচার পসরা। এবার মৌসুমে প্রচুর ইলিশ'সহ অন্যান্য সবধরনের মাছ পাবার প্রত্যাশা এই মাছ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতার।
গত ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভোলার নদ-নদীতে সবধরনের মাছ ধরায় ২ মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সরকার। এ সময় ভোলার মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবাদর, বেতুয়া, বুড়া গৌরঙ্গা এবং ইলিশা নদীসহ ইলিশের ৬টি অভয়াশ্রমে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিলো।
এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভোলায় জেলেদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা ও লিফলেট বিতরণ করেছে মৎস্য বিভাগ।
ভোলার মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও তৎসংলগ্ন নদীগুলোতে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে গত ২ মাসের এ নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে নদীতে নামতে পারেনি জেলেরা।
ভোলা জেলা মৎস্য মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বাসস’কে বলেন, জনসচেতনতা সভাগুলোতে কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগের প্রতিনিধি, মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলেরা অংশ নিয়েছেন।
মৎস্য কর্মকর্তা জানান, মেঘনা ও তেঁতুলিয়াসহ এখানকার নদীসমূহের ১৯০ কিলোমিটার এলাকার ২টি অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মৎস্য শিকার বন্ধ ছিলো। এতে করে জাটকা (ছোট ইলিশ) রক্ষা'সহ অনান্য সবধরনের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ছে বলে জানান তিনি। মৎস্য বিভাগের উদ্যোগে গত ২মাস ধরে স্থানীয় হাট-বাজার, জেলেপল্লি, মাছঘাট ও মৎস্য আড়ৎগুলোতে জেলেদের নিয়ে অনুষ্ঠিত জনসচেনতা সভা অব্যাহত ছিলো।
তিনি আরো জানান, এ সময়ে জেলেদের গ্রহণ করা ঋণের কিস্তিও ছিলো স্থগিত। ভোলার অভয়াশ্রম'সহ দেশের মোট ৬টি মৎস্য অভয়াশ্রমে একইসময় থেকে ইলিশ ও অন্যান্য মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা ছিলো।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, শুধু জাটকা নয়, একই সময় একই সাথে অন্যান্য সকল মাছের পোনা অভয়াশ্রমে বড় হওয়ার সুযোগ পায়। অভয়াশ্রম থেকে ২মাস মাছ শিকার করা থেকে বিরত থাকায় ইলিশ'সহ সব প্রকারের মাছের সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রত্যাশা তার।
ভোলার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর নেতারা বাসস’কে জানান, নিষেধাজ্ঞাকালীন সময় জেলার নিবন্ধিত এক লাখ ৬৮ হাজার জেলের মধ্যে এক লাখ জেলে সহায়তা পেলেও নিবন্ধিত ৬৮ হাজার জেলে এ সুবিধা থেকে এখনো বঞ্চিত রয়েছেন। তাছাড়া আরো অনিবন্ধিত লক্ষাধিক জেলের সহায়তার দাবি জানান মৎস্যজীবীরা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানান, দুই মাসের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে ৯০ হাজার ২শত ১৩ জন জেলেকে মাসে ৪০ কেজি করে সরকারি চাল দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এই প্রথমবারের মতো সরকারের পক্ষ থেকে ৬ রকমের নিত্যপণ্য সামগ্রীও দেয়া হয়েছে জেলেদের। সবমিলিয়ে অন্যবারের চেয়ে বর্তমান সরকারের সময়ে চালের পাশাপাশি আরো ৬ প্রকারের নিত্যভোগ্যপণ্য পেয়ে খুবই আনন্দিত দ্বীপ উকূলীয় জনপদের জেলে সম্প্রদায়।