শিরোনাম

প্রতিবেদন : মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহী
ঢাকা, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : মহান মে দিবসের প্রাক্কালে শ্রমিকনেতারা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত শ্রমিক ডাটাবেজ তৈরি এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত রূপান্তরে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির দাবি জানিয়েছেন।
বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন-২০২৬-কে দেশের শ্রম সংস্কার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে তারা কার্যকর বাস্তবায়ন ও আরও কিছু উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য তাসলিমা আখতার বলেন, এবারের মে দিবস বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে, কারণ এটি বৈশ্বিক শ্রমিক আন্দোলনের ১৪০ বছর পূর্তির সময়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনে আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।’
তিনি বলেন, কম মজুরির কারণে শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়। ‘বেঁচে থাকার জন্য শ্রমিকদের বাড়তি সময় কাজ খুঁজতে হয়। এটি এমন একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করবে,’ যোগ করেন তিনি।
তাসলিমা আখতার বলেন, নতুন আইনে সহজে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ শিল্পখাতে আরও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা যখন স্বাধীনভাবে সংগঠিত হতে পারেন, তখন তারা আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে পারেন। এতে সংঘাত কমে এবং জবাবদিহি বাড়ে।’
গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সংশোধিত শ্রম আইনকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এটি ‘বাংলাদেশের শ্রম সংস্কারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’।
তিনি উল্লেখ করেন, উৎসব ছুটি বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা কমিটি গঠন এবং কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধসংক্রান্ত সুরক্ষা অন্তর্ভুক্তির মতো নতুন বিধানগুলো তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি নির্দেশ করে।
তিনি বলেন, ‘তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। যথাযথ বিধিমালা ও প্রয়োগের মাধ্যমে আইনকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।’
বাংলাদেশ ট্যানারি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাতীয় নূ্যূনতম মজুরি নির্ধারণই এখন সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, ‘খাতভেদে নয়, সব শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম মজুরি আমাদের এক নম্বর দাবি। সরকারকে একটি মজুরি কমিশন গঠন করে জাতীয় ভিত্তিমজুরি ঘোষণা করতে হবে, যাতে কোনো শ্রমিক পিছিয়ে না থাকে।’
তিনি আরও বলেন, খাতভিত্তিক মজুরি বোর্ডগুলোকে আরও কার্যকর করা জরুরি। ‘মজুরি পুনর্র্নিধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে,’ বলেন তিনি।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়ে আবুল কালাম আজাদ সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়নকে স্বাগত জানাই। তবে তা যেন কর্মসংস্থানের বিনিময়ে না হয়। বাংলাদেশ মতো শ্রমঘন দেশে আধুনিকায়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থানকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’
বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা বিশ্বাস করেন, জীবিকা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হবে।’
বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের (বিএলএফ) নির্বাহী পরিচালক এ কে এম আশরাফ উদ্দিন শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা ও উদীয়মান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও চামড়ার মতো রপ্তানিমুখী খাতের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনও অস্বীকৃত এবং প্রায়ই অনিয়মের মধ্যে রয়েছে।
টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য এই অদৃশ্য অংশগুলোকে সমাধানের আওতায় আনতে হবে।’
তিনি বলেন, মানবাধিকারভিত্তিক যথাযথ পর্যালোচনা ও জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী বৈশ্বিক নীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে।
‘শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে জাতীয় নীতিতে যথাযথ পর্যালোচনাব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন,’ বলেন তিনি।
আশরাফ উদ্দিন আরও বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রমিক ডাটাবেজের অভাব সংস্কারের পথে বড় বাধা।
তিনি বলেন, ‘যথাযথ ডাটাবেজ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা কিংবা শ্রমিকদের পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের শ্রমশক্তির বড় অংশই এ খাতে নিয়োজিত।’
ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি রূপান্তর ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসার শ্রমিকদের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যদি যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত না করা হয়।
তিনি বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা জোরদার ও দক্ষতার ঘাটতি পূরণ না করা গেলে শ্রমিকদের ঝুঁকি বাড়বে। দক্ষতা উন্নয়ন ও তরুণ কর্মশক্তিকে প্রস্তুত করতে বিনিয়োগ জরুরি।’
সংশোধিত শ্রম আইন সম্পর্কে আশরাফ উদ্দিন বলেন, এটি ‘ইতিবাচক হলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়াসম্পন্ন’ একটি পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, ‘আমরা আইনটিকে স্বাগত জানাই। তবে মাতৃত্বকালীন সুবিধা নির্ধারণ এবং কিছু বিধানের স্পষ্টতার মতো বিষয় আরও পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের প্রয়োজন রয়েছে।’
তৃণমূল পর্যায়ের শ্রমিকরাও এসব উদ্বেগের কথা জানিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক কোহিনুর আখতার বলেন, ‘মজুরি বাড়ানো হলে এবং ওভারটাইম ঠিকভাবে নিশ্চিত করা গেলে আমাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসবে। আমরা স্থিতিশীলতা ও ন্যায্য আচরণ চাই।’
ঢাকার গৃহকর্মী নাজমা আখতার সংশোধিত আইনে স্বীকৃতি পাওয়াকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়নে ঘাটতির কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, এটা ভালো। কিন্তু কর্মঘণ্টা, ছুটি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম দরকার, যাতে এই স্বীকৃতির বাস্তব অর্থ থাকে।’
শ্রমিকনেতারা বলেন, শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা শিল্পসম্পর্ক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা একমত পোষণ করেন যে, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা, কমপ্লায়েন্স জোরদার করা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই হবে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রমবাজার গঠনের মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশ মহান মে দিবস পালন করার এ সময়ে শ্রমজগতের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা এসব কণ্ঠস্বর ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও দায়িত্বশীল আধুনিকায়নের সমন্বয়ে শ্রমিক ও অর্থনীতির জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণে অভিন্ন আকাঙ্খার দিকেই ইঙ্গিত করছে।