বাসস
  ১৩ মার্চ ২০২৬, ১৪:৪৫

মেহেরপুরে ঈদের কেনাকাটা আর দর্জি পাড়ার নির্ঘুম রাত

ছবি : বাসস

দিলরুবা খাতুন

মেহেরপুর, ১৩ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): ঈদ মানেই আনন্দের উচ্ছ্বাস, নতুন পোশাকের ঘ্রাণ আর ব্যস্ততার রঙিন দিনগুলো। রমজানের শেষভাগে শহর-বন্দরের অলিগলি যেন উৎসবের অপেক্ষায় থরথর করে কাঁপছে। বাজারে ভিড় বাড়ে, কাপড়ের দোকানে রঙিন ঢেউ ওঠে। আর সেই উৎসবের প্রস্তুতির নেপথ্যে নির্ঘুম রাত কাটান দর্জি পাড়ার পোশাক তৈরির কারিগররা—যাদের নিপুণ হাতে তৈরি হয় ঈদের নতুন সাজ।

দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে ঝুলিয়ে রাখা নানা রঙের পোশাক। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে যেন কোনো গার্মেন্টস কারখানা। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়—এগুলো মেহেরপুর শহরের টেইলার্সের দোকান। কারিগররা গ্রাহকের অর্ডার অনুযায়ী পোশাক বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন।

ঈদকে সামনে রেখে মেহেরপুরের টেইলার্সগুলোতে এখন নির্ঘুম রাত পার করছেন পোশাক তৈরির কারিগররা। রাত-দিন সমান তালে ঘুরছে সেলাই মেশিনের চাকা। বাহারি ডিজাইনের পোশাক তৈরি করে কাস্টমারের মন জয় করার পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন তারা।

একসময় এই দর্জি পেশায় খুব বেশি মানুষ আসতে চাইতেন না। একযুগ আগেও হাতে গোনা কয়েকজন পোশাক তৈরির কাজ করতেন। তখন তাদের ‘খলিফা’ নামে ডাকা হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সেলাই মেশিন রয়েছে, অনেক গৃহিণীও নিজে সেলাই করেন। তারপরও টেইলার্সের ব্যবসা রমরমা। তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ অনেকেই পছন্দের কাপড় কিনে দর্জির কাছে পোশাক বানাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে রমজানের ১৫ তারিখের পর থেকেই দর্জিপাড়ায় ব্যস্ততা তুঙ্গে ওঠে। রাতভর চলছে কাপড় কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের কাজ। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নতুন পোশাক তৈরিতে। একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন নতুন পোশাক পরে নামাজ আদায় করার ঐতিহ্য যেন সবাইকে নতুন সাজের আনন্দে উদ্বেল করে।

সরেজমিনে শহরের শিউলি টেইলার্স, নিউ শিউলি টেইলার্স, শাপলা টেইলার্স, স্টুডেন্টস টেইলার্স, ঢাকা টেইলার্স, কাশফুল টেইলার্স, শহিদ টেইলার্স, বর্ণালী টেইলার্স ও মিতালী টেইলার্সে গিয়ে দেখা যায় ব্যস্ততার চিত্র। নারী ও পুরুষ দর্জিরা একসঙ্গে সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্টসহ নানা পোশাক তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাড়া-মহল্লার ছোট ছোট দর্জি দোকানেও একই চিত্র।

আয়েশা লেডিস টেইলার্সের কাটিং মাস্টার রাজু আহমেদ বাসস’কে জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৫ জন কাজ করেন। প্রতিদিন প্রায় ১শ’টি পোশাক তৈরি হয়। ঈদের পরেও এক সপ্তাহের অর্ডার নেয়া আছে।

শাপলা টেইলার্সে ১২ জন কারিগর কাজ করছেন। তারা প্রত্যেকে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫টি পোশাক সেলাই করছেন।

কারিগর বাবু হোসেন বলেছেন, ‘প্রচুর কাজের চাপে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করতে হচ্ছে। তবে মজুরি খুব বেশি বাড়েনি। অতিরিক্ত কাজের চাপে বিশ্রামও ঠিকমতো নেয়া যাচ্ছে না।’

স্টুডেন্টস টেইলার্সের কাটিং মাস্টার নুরুজ্জামান জানান, ‘রোজার ১৫ তারিখ হলেই আমরা নতুন অর্ডার নেয়া বন্ধ করে দিই। যারা আলাদা ডিজাইন ও ভালো ফিটিং চান, তারাই সাধারণত আমাদের কাছে আসেন।”

পোশাক বানাতে আসা শামীমা আক্তার জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা আয়েশা টেইলার্সে পোশাক বানান। এবারও তিন থেকে চার সেট পোশাক বানিয়েছেন। তবে এবছর দর্জির মজুরি কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাকের দোকানে প্রায় একই ধরনের ডিজাইন থাকে। তাই আমি প্রতি ঈদেই নিজের পছন্দের কাপড় কিনে দর্জির কাছ থেকে বানিয়ে নিই’।

টেইলার্স মালিকরা জানান, এ বছর সুতি, জর্জেট, কাতান সিল্ক, ভেলভেট, নেট, তসর ও টিস্যু কাপড়ের চাহিদা বেশি। পাশাপাশি জরি, চুমকি ও কুন্দনের কাজ করা পোশাকের অর্ডারও বেড়েছে। সুতি কাপড়ে লেইস লাগিয়ে তৈরি বাহারি ডিজাইনের পোশাকও ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।

ঈদের আনন্দ যেমন মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, তেমনি সেই আনন্দের নেপথ্যে দর্জিপাড়ার কারিগরদের ঘাম আর নির্ঘুম রাতের গল্পও জড়িয়ে থাকে—যাদের পরিশ্রমে তৈরি হয় উৎসবের নতুন সাজ।