শিরোনাম

\ দিলরুবা খাতুন \
মেহেরপুর, ১১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : রাজা শেখ যখন ছোট ছিলেন, তখন মেহেরপুর জেলা শহরের মল্লিক পাড়া ছিল অনেকটা অন্যরকম। পাকা রাস্তা ছিল না, আলো জ্বলতো কেরোসিন কুপি বাতিতে। আর পানির জন্য কুয়া বা কল ছিল পাড়ায় মাত্র একটি। গরিবের ঘরে জন্মেছিল রাজা। মা গৃহিণী, বাবা রহমতুল্লাহ শেখ একজন ছিলেন শ্রমজীবী, রোজগার হতো দিন কোনো মতে চালানোর মতোই।
মেহেরপুর শহরের আকাশটা গভীর নীলচে, ভোরের আলো তখনও আসে না। চারপাশটা যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে কোনো অদৃশ্য ডাকের জন্য। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত তিনটা পেরিয়ে গেছে। নিস্তব্ধ রাস্তাগুলোকে হঠাৎ চিরে দেয় এক মৃদু কণ্ঠস্বর: ‘এলো হে মাহে রমজান, জাগো জাগো মুসলমান। রোজা করো নামাজ পড়, জাগো মুসলমান’/ ‘এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি, খোদা তোমার মেহেরবানি’ পুরোনো একটি রিকশাভ্যানে করে চলা তার সেহরির সুরের সফর শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালের কোনো এক রমজানে। বয়স তখন খুব বেশি না, হয়তো পনেরোর কোঠা। শিক্ষা ছিল না বেশিদুর, পঞ্চম শ্রেণি পেরিয়ে আর পড়া হয়নি দারিদ্র্েযর কারণে। তবে জীবন তাকে যা দিয়েছে, তা দিয়ে শহরটাকে ফিরিয়ে দিতে শিখেছেন তিনি।
সেই সময় শহরের বিভিন্ন যুবক একসঙ্গে দল বেঁধে কাশিদা গাইত, বাদ্য বাজাত, মানুষকে সেহরির জন্য জাগিয়ে তুলত। এখন তারা সবাই থেমে গেছে, কেউ শহর ছেড়েছে, কেউবা বাণিজ্যিকভাবে কাশিদার সাথে জড়িয়ে আছে। কেউ জীবনের খেয়ালেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু রাজা থামেন নি। আর্থিক সংকট থাকলেও মনের দিক দিয়ে সে নামের মতোই রাজা।
রমজান মাসের প্রথম সেহরি থেকে শুরু করে সেই চাঁদরাত পর্যন্ত এখনও ডেকে যাচ্ছেন রোজাদারদের। এখনও পুরোনো একটি মাইকের ভাঁজে ভাঁজে ভেসে আসে সেই কণ্ঠ। ছোট্ট শহরটা যেন প্রাণ ফিরে পায়। কেউ জানালার পর্দা সরিয়ে শোনে, কেউ বিছানা ছেড়ে হালকা হাসে। ঘরের ভেতরে রান্নাঘরে শুরুর তৎপরতা দেখা যায়। রোজার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।
কিন্তু কণ্ঠটা কার? সেই মানুষটির নাম রাজা শেখ।
ছেলেবেলা থেকে রাজা কিছুটা আলাদা ছিল। পাড়ার অন্য ছেলেরা যখন খেলত, সে তখন মায়ের পাশে বসে তাকিয়ে থাকত মাটির উনুনে সেদ্ধ হওয়া চালের দিকে। কখনো হাতে ধরিয়ে দিত গজলের একটা খাতা, ভাঙা পাতায় লেখা:‘আল্লাহ তুমি দয়াময়, রহমতের দরিয়া, তোমার নামে ভরসা রাখি, তুমিই পথের গিয়া।’
এই গান, এই গজলই ছিল তার প্রথম সঙ্গী। স্কুলে গিয়েছিল মাত্র কয়েক বছর। পঞ্চম শ্রেণির পর আর যাওয়া হয়নি। মা অসুস্থ, বাবার আয়ে সংসার চলে না। রাজা বুঝে যায়- এই শহরে মানুষের ঘুম ভাঙাতে হলে আগে নিজেকে জাগাতে হবে। তাই একদিন বইয়ের ব্যাগ ফেলে রেডিও’র কারিগর হতে একটি দোকানে কাজ শিখতে যান। কয়েক বছর পর হোটেল বাজারে ‘রাজা তরঙ্গ’ নামে নিজেই প্রতিষ্ঠান খুলে বসে। নামডাকও হয়। কিন্তু প্রযুক্তির কারণে আর সব কারিগরের মতো তাকেও পাততাড়ি গোটাতে হয়। শুরু করেন নতুন ইলেক্ট্রোনিক্স সামগ্রি বিক্রি। এখনও চলছে সেই ব্যবসা। তবে রমজান মাস আসলেও তাকে মধ্যরাত ডাকে। রোজাদারদের ডাকতে।
প্রথমবার সেহরির ডাক দিতে গিয়েছিল ১৯৮০ সালের রমজানে। তখনো সে তরুণ। তখন সাউন্ড সিস্টেম বলতে টিনের চুঙ্গা। হাতে মোটা শক্ত লাঠি নিয়ে বিদ্যুৎ আর টেলিফোনের লোহার খাম্বায় কয়েকটি বাড়ি দিয়ে টিনের চঙ্গে মুখ লাগিয়ে সেহরি খাবার আহবান জানাতেন। দিন বদলেছে। এখন রিক্সা ভ্যানে বেরিয়ে পড়ে শহরের অলিগলিতে। কণ্ঠে থাকে গজলের সুর: ‘সেহরির সময় হয়েছে, উঠো রোজাদার ভাই-বোনেরা, রহমত এসেছে, আল্লাহর দয়া দরজায়, জান্নাত আজ হেসেছে।’
শুরুর দিকে মানুষ চমকে উঠেছিল। কেউ হাসত, কেউ বলত ‘নতুন ছেলেটা কি করছে?’ কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে শহর যেন তার কণ্ঠের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেল। একদিন এক বুড়ি জানালায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘বাবা, তোর কণ্ঠে ঘুম ভাঙলে ভালো লাগে। আল্লাহ তোকে বাঁচাইয়া রাখুক।’
সেই এক কথাই রাজাকে বাঁধল ভালোবাসার জালে। সেদিন বুঝেছিল, শুধু গান নয়, সে যে কাজ করছে তা মানুষের উপকার, তবে ইবাদতের রূপে।
রাজা জানায়, সে সারাদিন রোজা শেষে বাড়িতে ইফতার করত। তারাবির নামাজ পড়ে আর ঘুমান না। রাত ৩টার দিকে মানুষকে জাগাতে বাহনে মাইক লাগিয়ে পথে বের হন। সেহরি খেয়ে বেলা ১০টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকেন রমজান মাসজুড়ে।
রাজা বলেন, মানুষকে রোজার সময় সঠিকভাবে সেহরি খাওয়ার সুযোগ করে দিতেই আমি এই কাজ করি। এটা আমার ইবাদতের অংশ। টাকা চাই না, খালি চাই দোয়া। রাজা এবারও সেহরির আগে আগে ডেকে যাচ্ছে, মা বোনেরা উঠুন। সেহরির সময় হয়ে গেছে।