শিরোনাম

নওশীন আনজুম
ঢাকা, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : আশা, স্থিরতা ও সংযোগের এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তারেক রহমান বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি তাঁর দল বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে এবং এই জয়ের ঢেউয়ের কেন্দ্রে উঠে আসেন তারেক রহমান, যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।
১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর তিনি এমন এক বার্তা নিয়ে ফিরে আসেন, যা শোনার জন্য অগণিত মানুষ প্রস্তুত ছিল। সমর্থকদের কাছে তিনি আশার প্রতীক হয়ে আসেন। তারা তারেক রহমানকে স্বাগত জানায়, আস্থা রাখে এবং দেশ পরিচালনার জন্য তাঁকে ভোট দেয়।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিমান থেকে নেমে আসার পরপরই তিনি সরাসরি মানুষের কাছে যান। ক্লান্তির কোনো চিহ্ন ছিল না। তিনি সমর্থকদের শুভেচ্ছা জানান এবং দেশকে পুনর্গঠন ও উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা বলেন।
লাল-সবুজে সজ্জিত বাসে ভ্রমণ করে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ থিমের প্রচারণায় তিনি সেই সংযোগকে সারা দেশে বিস্তৃত করেন। প্রচারণাকালে তিনি সিলেট থেকে ফেনী, চট্টগ্রাম থেকে বগুড়া পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা সফর করেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন এবং প্রতিটি সফরকে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে একেকটি আলাপে রূপ দেন।
পুরো প্রচারণা জুড়ে তারেক রহমান বারবার আশা ও ইতিবাচকতার ভাষায় কথা বলেন। তিনি পুনর্গঠনের কথা বলেন, অংশগ্রহণের কথা বলেন, নাগরিকদের এই অনুভূতি দেওয়ার কথা বলেন যে, রাষ্ট্র তাদেরই। বছরের পর বছর রাজনৈতিক তিক্ততার পর এই সরল বার্তাটি ছিল শক্তিশালী।
দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা কড়াইলের বাসিন্দা— যেই হোন না কেন, তারেক রহমান মানুষের সঙ্গে বিনয় ও সৌজন্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি উষ্ণ হাসিতে শুভেচ্ছা জানান, মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং ভদ্র ভাষায় কথা বলেন। এই দৈনন্দিন যোগাযোগ অনেক ভোটারের কাছে তাঁর ব্যক্তিত্ব বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।
মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের বাইরেও তাঁর যত্নের প্রকাশ দেখা যায়। তাঁর পোষা প্রাণী ‘জেবু’র প্রতি অনুরাগের কথা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে। তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের জন্য একটি পশু চিকিৎসাকেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসব তথ্য মিলিয়ে তাঁর মধ্যে সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতার একটি চিত্র গড়ে ওঠে, যা রাজনীতির পাশাপাশি মানবিকতার মূল্যবোধকে জোরদার করে।
অন্তর্ভুক্তি ছিল তাঁর বার্তার আরেকটি স্তম্ভ। তিনি বারবার নারীর ক্ষমতায়ন এবং জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অধিক অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের ভাবনা শোনেন এবং দেশ গঠনে তাদের ভূমিকা কল্পনা করতে আহ্বান জানান। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যাপারে জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের সবাই এই ভূখণ্ডের অংশ এবং ভবিষ্যতে সবারই অংশীদারিত্ব রয়েছে।
তাঁর চিন্তায় একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাত্রাও ছিল। তারেক রহমান বারবার দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরেন। বক্তব্য ও আলাপে তিনি সাহিত্য, সঙ্গীত ও ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই সবকিছুই তিনি উপস্থাপন করেছেন এমন এক ভঙ্গিতে, যাকে অনেকেই বুদ্ধিদীপ্ত অথচ কোমল বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কণ্ঠস্বরও ছিল লক্ষণীয়। তিনি রাগান্বিত ভাষায় প্রচারণা চালাননি। তাঁর বক্তব্য ছিল পরিমিত, অনেক সময় সংক্ষিপ্ত। চ্যালেঞ্জের মুখেও তিনি দৃশ্যমান বিরক্তি ছাড়াই প্রতিক্রিয়া জানান। সমর্থকরা তাঁর বিনয় ও মাটির মানুষের মতো আচরণকে পরিপক্বতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন— যা তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সংঘাতের সঙ্গে নয়।
এরপর আসে চিত্রভাষা। তাঁর জনসমক্ষে উপস্থিতিতে ছিল সংযমের প্রকাশ। তিনি প্রায়ই সাধারণ পোশাক পরতেন, সাধারণত হালকা রঙের, বিশেষ করে সাদা—যা স্বচ্ছতা, প্রশান্তি ও স্থিরতার বার্তা বহন করে। আড়ম্বর ছিল খুবই কম। দৃশ্যমান বার্তাটি তাঁর কথার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল: নাটকের চেয়ে স্থিতিশীলতা, প্রদর্শনীর চেয়ে সরলতা।
তবে তাঁর আবেদন শক্তির সবচেয়ে বড় উপাদান ছিল নৈকট্য।
ভোটাররা বারবার দেখেছেন তিনি ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, উষ্ণ করমর্দন করছেন, প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন, শিশুদের স্নেহভরে অভিবাদন জানাচ্ছেন। তাঁর স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে মুহূর্তগুলো একজন পারিবারিক মানুষ হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরো দৃঢ় করেছে—যিনি সাধারণ সম্পর্কের মধ্যে প্রোথিত। রাজনীতিতে মতাদর্শের চেয়ে পরিচিতি দ্রুত আস্থা গড়ে তুলতে পারে।
চলাচলও হয়ে ওঠে এক রূপক। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে সফর, সরাসরি মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ—তিনি এমন এক নেতার ধারণা তৈরি করেন, যিনি মানুষের কাছে যেতে প্রস্তুত। প্রতিটি উপস্থিতি এই বর্ণনাকে আরো জোরদার করে যে, গতি তৈরি হচ্ছে এবং ইতিহাস হয়তো নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে।
তাঁর বক্তব্য সেই অনুভূতিকে আরো বিস্তৃত করে। জাতীয় ঐক্য, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এবং ভবিষ্যতমুখী গণতন্ত্রের উল্লেখ উন্মুক্ততার ইঙ্গিত দেয়। যারা তাঁর ব্যাপারে দ্বিধায় ছিলেন, তারাও বিভাজনহীন ভাষা ব্যবহারের প্রচেষ্টাকে লক্ষ্য করেছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাস্তবতা। বিমূর্ত তত্ত্বের বদলে তিনি জোর দিয়েছেন দৈনন্দিন বাস্তবতার ওপর—কর্মসংস্থান, সুযোগ, মর্যাদা, নারী ও তরুণদের অন্তর্ভুক্তি। দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে যুক্ত করে তিনি বড় প্রতিশ্রুতিগুলোকে নাগালের মধ্যে এনে দেন।
দিনের পর দিন তারেক রহমান নিজের একটি ধারাবাহিক রূপ উপস্থাপন করেছেন: মৃদুভাষী কিন্তু দৃঢ়, ঐতিহ্যনিষ্ঠ কিন্তু সমসাময়িক, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু সহজপ্রাপ্য।
নির্বাচনের রাতে অনেক সমর্থক মনে করেছেন তারা কেবল একটি দলের প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন না। তারা একটি স্বভাব বেছে নিচ্ছে—শাসনের একটি ধরণ, শোনার একটি পদ্ধতি, শান্তির রাজনীতির একটি প্রতিশ্রুতি।
ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরও তারেক রহমান বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই পদক্ষেপটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আলোচিত হয়। এটি সংলাপ বজায় রাখার আগ্রহের ইঙ্গিত দেয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সব অংশীজনের প্রতি, এমনকি বিরোধী পক্ষের প্রতিও, সম্মান প্রদর্শন করে। অনেকের কাছে এই উদ্যোগ রাজনীতিতে সৌজন্য, যোগাযোগ ও সহাবস্থানের ওপর জোর দেওয়া এক নেতার চিত্রকে আরো দৃঢ় করে।
সব মিলিয়ে এসব মুহূর্ত তারেক রহমানের একটি স্পষ্ট চিত্র নির্মাণ করেছে—শান্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানুষের কাছাকাছি। তাঁর কথা, আচরণ ও অঙ্গভঙ্গি সমর্থনকে বিজয়ে রূপ দিতে সহায়তা করেছে।
এখন শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়, নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তি হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তিনি।