
চট্টগ্রাম, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : জীবনের প্রথম ভোট দিতে এসে উচ্ছ্বাসে ভাসলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস বিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলামসহ চট্টগ্রামের তরুণ ভোটারররা। একইভাবে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর ৭৫ বছর বয়সি অসুস্থ জহুরুল ইসলাম পাটোয়ারীসহ প্রবীণ ভোটাররা ঝামেলাহীন ভোট দিতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম-৯ আসনের কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম। জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার পর তিনি বলেন, এটি স্মরণীয় মুহূর্ত, সেজন্য সেলফি তুলে রাখলাম। বিগত সময়ে ভোটের নামে তামাশা আমরা দেখেছি। আজ প্রথমবার শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়েছি। তাই আমার ভোটের অনুভূতি জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তৌহিদুলের বন্ধু চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জুলফিকার হোসেন প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বলেন, আমি আশা করি এই ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন সূর্য উদয় হবে এবং সমস্ত জুলুম ও অত্যাচার শেষ হবে।
জামালখান ডা. খাস্তগীর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২২ বছর বয়সি কলেজ ছাত্রী তাসফিয়া তারান্নুম বলেন, ‘এটা আমার জীবনের প্রথম ভোট। ব্যালট হাতে নেয়ার মুহূর্তটা খুবই আবেগের ছিল। মনে হয়েছে, আমার একটি ভোটও দেশের ভবিষ্যৎ বদলাতে ভূমিকা রাখতে পারে।’
ফারহানা ঝুমা বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে ঢোকার আগে একটু নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু ভেতরে গিয়ে দেখলাম সবকিছু খুব সুন্দরভাবে সাজানো। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।’
রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এতদিন শুধু বড়দের ভোটের কথা শুনতাম, আজ নিজে দিলাম। শান্ত পরিবেশে ভোট দিতে পেরে ভালো লেগেছে। আশা করি, আমাদের প্রজন্মের মতামত গুরুত্ব পাবে।’
লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা তরুণ কছিম উদ্দিন বলেন, ‘শুধু অভিযোগ করলে হবে না, পরিবর্তন চাইলে ভোট দিতে হবে- এই বিশ্বাস থেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছি ভোট দেওয়ার জন্য।
তানভীর কৌশিক বলেন, ‘লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক তরুণকে দেখে ভালো লাগছে। মনে হয়েছে, আমাদের প্রজন্ম ভোটের প্রতি আগ্রহী।’
লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার কে বি এম মোস্তফা জামান জানিয়েছেন, প্রথমবারের ভোটারদের অনেকেই নিয়মকানুন জানতে চেয়েছেন, কিন্তু ধৈর্য ধরে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন।
ভোট কেন্দ্রে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, আমি গত ১৫ বছর ভোট দিইনি, ভোট হয়নি কোথায় দিব। আমি এ বয়সে এসে ভোট দিয়ে আনন্দ অনুভব করছি, স্বস্তি বোধ করছি। আমরা চাই দেশটা ভালো হোক, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ভালো থাকুক।’
একই কেন্দ্রে ৩৫ বছর বয়সি সুমন বলেন, ‘আমাদের ছোট ছোট চ্যালেঞ্জ থাকলেও সবাই দায়িত্বের সঙ্গে ভোট দিচ্ছে।’ ৪২ বছর বয়সি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমবার ভোট দিচ্ছি না, কিন্তু এত সুন্দরভাবে ভোট প্রদানের পরিবেশ দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই আনন্দদায়ক।’
আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন অধিদপ্তর কেন্দ্রের একটি বুথে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ৩৫৪টি ভোট গ্রহণ করা হয়। প্রিসাইডিং অফিসার কে বি এম মোস্তফা জামান জানান, দুটি ব্যালট পেপারে একজন ভোটার ভোট দিতে গড়ে দেড় থেকে দুই মিনিট সময় নিচ্ছেন। বয়স্ক ভোটারদের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা বেশি লাগছে। এই কেন্দ্রে মোট ভোটার প্রায় ২ হাজার ৮৬২ জন এবং বুথ রয়েছে তিনটি। সকাল থেকেই বুথগুলোর সামনে ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
নগরীর গুলজার বেগম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাতনিকে সাথে নিয়ে ভোট দিতে আসেন মমতাজ বেগম (৬৭)। তিনি বলেন, শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় পরিবারের সদস্যরা ভোট দিতে আসতে নিষেধ করেছিল। আগে তিন-চারবার ভোট দিয়েছি। তবে মাঝখানে ১৫ বছর ভোট কেন্দ্রে আসতে হয়নি। এবার পরিবেশ আগের চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে। কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিয়ে ফিরে যাচ্ছি।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের শুলকবহর এলাকার ভোটার গার্মেন্টসকর্মী চাঁদনী মজুমদার বলেন, আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে আমাদের সুরক্ষা চাই। আমরা এমন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি, যাতে শান্তিতে থাকতে পারি। আমরা চাই, যিনি নির্বাচিত হবেন তিনি মুসলিম-হিন্দুসহ সব ধর্মের মানুষকে সমানভাবে দেখবেন।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে ‘ফ্যাক্টর’ তরুণ ভোটাররা। ৬৬ লাখ ১৬ হাজার ৭১২ জন ভোটারের মধ্যে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে তিন লাখ চার হাজার ৫১ জন। যাদের অধিকাংশই তরুণ। তিন লাখের অধিক তরুণ ভোটারের বেশিরভাগই প্রথমবারের মতো ভোট দিবেন। এ কারণে এসব তরুণদের মধ্যে ভোট নিয়ে উচ্ছ্বাস বেশি।