বাসস
  ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:৪৭

মাদকমুক্ত নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা চান সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ

ছবি: বাসস

\ মো. আসাদুজ্জামান \

সাতক্ষীরা, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তারপরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। এখন অপেক্ষায় দেশবাসী। শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা প্রার্থীদের মধ্যে। আর ভোটাররা দেখছেন কোন্ প্রার্থী ক্ষমতায় আসলে তারা নিরাপদ জীবন পাবেন। এলাকার উন্নয়ন কার হাতে হবে। 

দেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমের সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরার ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পরিবেশগত কারণে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা। এ জেলার রাজনীতির ভাগ্যও তাই নির্ধারিত হয় এলাকার জনগণের চাহিদার সাথে রাজনীতিবিদদের দূরদর্শিতার ভিত্তিতে।

সাতক্ষীরা জেলাকে দুটি সংসদীয় আসনে ভাগ করা হয়েছে। তালা ও কলারোয়া উপজেলা নিয়ে সাতক্ষীরা ১ আসন গঠিত। এই আসনের আয়তন মোট ৫৬৮.৬৬ বর্গ কিলোমিটার। মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৩৮১ জন। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯২ হাজার ১৯৮ জন। নতুন ভোটার সংখ্যা ২০ হাজার ২৯০ জন। এই আসনে কলারোয়া একটি পৌরসভা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ৫টি রাজনৈতিক দলের পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. ইজ্জত উল্লাহ (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামি আন্দোলনের শেখ মো. রেজাউল ইসলাম (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির জিয়াউর রহমান (লাঙল) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের ইয়ারুল ইসলাম (ডাব)। 

সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই আসনে ভোটের লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তবে তারপরেই রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীর অবস্থান। 

স্থানীয় দলীয় সূত্রগুলো জানায়, একই আসনের সাবেক দুই বারের এমপি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিব ১৯৬৫ সালে বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার তুলসীডাঙ্গা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)সহ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ২০০৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। এখনও তিনি সেই পদে বহাল রয়েছেন। পেশায় তিনি একজন ঠিকাদার।

জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ কলারোয়া উপজেলার ফয়জুল্লাহপুর গ্রামে ১৯৫৬ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাশ করে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত। তিনি দীর্ঘ ১২ বছর জেলা জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য। 

ইসলামী আন্দোলনের শেখ রেজাউল করিম তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার যুগীপুকুর গ্রামে ১৯৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। রেজাউল করিম মাদ্রাসা বোর্ড থেকে ফাজিল পাশ। তিনি পেশায় একজন বেসরকারি কওমি মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনি ইসলামী আন্দোলন পাটকেলঘাটা থানা কমিটির সভাপতি।

ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাদক, সন্ত্রাস, জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সংকট, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও এ জেলা পিছিয়ে আছে। তাই তারা চান ভোট দিয়ে এমন কাউকে নির্বাচিত করতে যিনি জনগণের সমস্যা সমাধান করবেন। যিনি এলাকায় থেকে এলাকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন এমন মানুষকেই তারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান।    

বাসসের সাথে আলাপকালে সাতক্ষীরা শহরের তরুণ ভোটার আবীর হোসেন বলেন, ‘গত ১৭ বছরে মানুষ তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে নি। এবার ভোটে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি ভোট দেয়ার জন্য। সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে যিনি কাজ করবেন তাকেই যোগ্য মনে করি।’  

তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা, রাস্তা ঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সাতক্ষীরা গড়তে যে প্রার্থী কাজ করবেন তাকেই ভোট দেব।’ 

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মো. হাফিজুর রহমান মাসুম জানান, ‘যিনি এলাকার উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন তাকেই আমরা নির্বাচিত করতে চাই। সাধারণ ভোটারদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবে কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন।’ 

এদিকে প্রার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচিত হলে তারা সব সমস্যার সমাধান করবেন। তবে কারো কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা। যেমন, জলাবদ্ধতা নিরসন, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল ইত্যাদি। আবার কারো কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। তবে এ নিয়ে তো খুব বেশি জল্পনা-কল্পনার সময় নেই। ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন কে তাদের বেশি উপকারে আসবে। অবশ্য আদর্শ উপজেলা, মডেল থানা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও মন কাড়ছে ভোটারদের।

এছাড়াও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, ইভটিজিং, ব্যভিচার বন্ধ করাসহ নিরাপদ পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রার্থীরা। তালা, কলারোয়া ও পাটকেলঘাটাকে মডেল উপজেলায় রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন কেউ কেউ।  

রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনি আচরণবিধি পালনে নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশনা মানতে বাধ্য প্রার্থীরা। তাই তারা সবাই নির্বাচনি আচরণবিধি মানার ব্যাপারে সতর্ক। তারা মনে করছেন, আচরণবিধি না মানলে এবার ভোটারদের কাছেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে। তাই প্রার্থীরাও চান সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।    

এই নির্বাচনে জুলাই সনদ বিষয়ক গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই ইস্যুতে মোটামুটি সব প্রার্থীই একমত। তারা মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থ্যানের জন্যই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাই তারা নিজেরা যেমন জুলাই সনদের পক্ষে, তেমনি তারা জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য তাদের ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করছেন।  

তবে সব দলের প্রার্থীর প্রত্যাশা একটাই। আগামীকালের নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ। এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন কোনো ঘটনা তারা দেখতে চান না।