বাসস
  ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:১৩
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২০

সুনামগঞ্জের লঞ্চঘাটের ঐতিহ্য ফেরাতে প্রশাসনের উদ্যোগ

ছবি: বাসস

আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ, ৫ জানুয়ারি, ২০২৫ (বাসস): জল জোস্নার শহর সুনামগঞ্জে জন্ম নিয়েছেন অনেক কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদসহ অসংখ্য গুণিজন। এসব গুণিজনেরা সজ্জনতা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি তাদের কর্মতৎপরতায় শহরকে করতেন আলোকিত। 

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে তারা আড্ডায় মেতে উঠতেন। শহরের উকিলপাড়া, বালুরমাঠ ও লঞ্চঘাট। এর মধ্যে আড্ডার জন্য প্রসিদ্ধ স্থান ছিলো লঞ্চঘাট। লঞ্চযাত্রী ও প্রকৃতিপ্রেমিদের আগমনে গভীর রাতেও মানুষের আনাগোনায় জেগে থাকতো লঞ্চঘাট। জেগে থাকতেন সাহিত্য প্রেমী, কবি ও শিল্পীরা। পূর্ণিমার রাতে শহরে স্ট্রিট লাইটের বাতি নিভিয়ে জোস্নার আলো উপভোগ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতেন প্রয়াত পৌর চেয়ারম্যান কবি মমিনুল মউজদীন।

সুরমার আঁকাবাঁকা মনোরম পরিবেশে মনের গভীর থেকে এক অজানা প্রেমের ছোঁয়ায় মাতোয়ারা হয়ে উঠেন প্রকৃতি প্রেমিরা। লঞ্চঘাটে এখনও বিশিষ্টজনদের সমাগম ঘটে প্রতিনিয়ত। কেউ সুরমা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এই শহরের কালের সাক্ষী হয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী লঞ্চঘাট।

সুনামগঞ্জের ইতিহাস পাঠে জানা যায়, সুনামগঞ্জের লঞ্চঘাটটি ১৯৫০-এর দশকের দিকে (ষাটের দশকে) জেলা শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, যা তখন সড়ক যোগাযোগ দুর্বল হওয়ায় স্থানীয়দের জন্য অপরিহার্য ছিল। শুরুতে কাঠের পন্টুন (wooden pontoon) ব্যবহার করা হতো এবং পরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA) স্টিলের পন্টুন স্থাপন করে।

শহরের সুরমা মার্কেট এলাকায় নদীর তীরে ছিল স্টিমারঘাট। তখন এ স্থানে স্টিমার ভিড়তো বলে লোকমুখে স্টিমারঘাট নাম প্রচারিত হওয়ায় পরবর্তীতে এ স্থানটি স্টিমারঘাট নামেই পরিচিতি পায়। মালামাল বহনসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষও এ স্টিমারে আরোহণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতেন তখন।

এক সময় স্টিমার আসা বন্ধ হয়ে যায় সুনামগঞ্জে। এর কিছুদিন পর মানুষের জলপথে যাতায়াতের সুবিধার্থে আসে হাইপ্রিট নামক জলযান। এই হাইপ্রিট জলযান কিছুদিন চলাচলের পর বন্ধ হয়ে যায়। 

এরপর থেকে লঞ্চের যাত্রা শুরু। স্টিমার ঘাটে জলপথে চলাচলের জন্য আসতে শুরু করে কাঠের তৈরি লঞ্চ। তখন পাকিস্তান শাসনামল। এই স্টিমার ঘাটের আশপাশের এলাকাজুড়ে নদীর ঘাটে ভিড়তো লঞ্চ। মানুষ জেলার বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন এসব লঞ্চে। 

সুনামগঞ্জের নদীপথে বুরহান এক্সপ্রেস, জালালী, মুন্না, শিবলি এক্সপ্রেস, সাচনা কোম্পানির সাচনা এক্সপ্রেস, জামালগঞ্জ এক্সপ্রেস নামের এসব লঞ্চ চলাচল করত। ওই সময়ে আবুল মনসুর আহমদ তালুকদার লাল মিয়া ও রহমান মিয়ার একাধিক লঞ্চও ভিড়তো এসব ঘাটে। 

পাক ওয়াটার কোম্পানি: এছাড়াও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন কোম্পানির লঞ্চের আগমনের পর পাকিস্তান শাসনামলে পাক ওয়াটার কোম্পানির লঞ্চ আসে সুনামগঞ্জে। দেশের সর্ববৃহৎ কোম্পানি পাক ওয়াটার। এই কোম্পানির কর্তৃপক্ষ সুনামগঞ্জে এসে প্রথমেই লঞ্চের অফিস স্থাপনের জন্য স্থায়ী জায়গা নির্ধারণ করেন। 

তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক নিজাম উদ্দিনের কাছে চাওয়া হয় অফিসের জন্য স্থায়ী জায়গা। তখন লঞ্চঘাট এলাকায় রাজগোবিন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের পাশের খালি মাঠ অফিসের কাজে ব্যবহারের জন্য দেন মহকুমা প্রশাসক। 

অফিসের জায়গা পেয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ লঞ্চ ভিড়ানোর জন্য কাঠ দিয়ে পন্টুন তৈরি করেন। অফিসের কার্যক্রম শুরু করেই নিয়ে আসা হয় লঞ্চ। তখন জাহানারা এক্সপ্রেস নামের প্রথম লঞ্চ আসে পাক ওয়াটার কোম্পানির। এই পাক ওয়াটার কোম্পানির পর্যায়ক্রমে একে একে ২১টি লঞ্চ আসে সুনামগঞ্জে।

লঞ্চে করে যাত্রীদের তাড়াতাড়ি তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার প্রতিযোগিতা ছিল বেশি। লঞ্চগুলার মধ্যে ছিলো শরীফপুর এক্সপ্রেস, আজিজ মঞ্জিল, রুমি, মুসাফির, ডায়না, ওয়াহিদ-২, সিনথিকা, রতনা, জাকারিয়া, হান্নান এক্সপ্রেস, নুরুল এক্সপ্রেস। 

জানা যায়, তৎকালীন লঞ্চ সার্ভিস পরিচালনার জন্য ছিল কয়েকটি কোম্পানির লঞ্চের অফিস। যাত্রী সাধারণের চাহিদা মেটাতে ছিল পাকা রাস্তা থেকে নদীর তীর পর্যন্ত অর্ধশত দোকান-পাট। এর মধ্যে ছিল ছমাদের দুইতলা হোটেল। হোটেল বয় হাঁকিয়ে বলতো মাছ-ভাত দুই টাকা। ছিল চিটাগাং হোটেল ও তছকির উদ্দিনের হোটেল। দিবারাত্রি লোকে লোকারণ্য ছিল লঞ্চঘাট এলাকা। লঞ্চের ভেপু বাজানোর শব্দ মাতিয়ে তোলতো আশপাশের এলাকা। পুরো শহরসহ নদীর উত্তরপাড়ের দূরবর্তী কয়েকটি গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তো ভেপুর শব্দ।

এদিকে আশির দশকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ে এসব লঞ্চ। শূন্যতার হাতছানি পড়ে লঞ্চঘাটে। এরপর আবারও ক্রমান্বয়ে লঞ্চের সংখ্যা ও যাত্রী সাধারণ বাড়তে থাকে। 

১৯৯৫ সাল থেকে পুনরায় লঞ্চঘাটের রূপ যৌবন ফিরে পায়। ব্যবসা-বাণিজ্য সবই জমজমাট হয়ে উঠতে শুরু করে। লঞ্চঘাটে ঝুনু মিয়ার লঞ্চ একে এক আসতে থাকে প্রিন্স অব লক্ষ্মীপুর, লাল সাহেব, তমিজ তালুকদার ও মাহফুজ এক্সপ্রেস। সাচনা কোম্পানির আসে জামালগঞ্জ এক্সপ্রেস ও জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। আবারও জমে উঠে লঞ্চঘাট এলাকা। 

হঠাৎ করে লঞ্চ যাত্রী ও লঞ্চের বিলুপ্ত হওয়ার একমাত্র কারণ বলে জানা যায়, ১৯৮৪ সালের দিকে ইঞ্জিন চালিত নৌকার ব্যবহার শুরু করে মানুষ। পরবর্তীতে আবার ২০০৯ সালে লঞ্চঘাটে চলাচলের রাস্তা ও পন্টুনের আধুনিক সিঁড়ি নির্মাণ হয়।

ব্যবসায়ী শেনুর মিয়া জানান, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর লঞ্চঘাটের রাস্তার ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। ধীরে ধীরে নদীতে বিলীন হয় রাস্তা। এই ভাঙন পরিলক্ষিত হয় লঞ্চঘাটের ব্যবসায়ী ইদ্রিছ আলীর দোকান থেকে পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত। এতে ৫০টি দোকানের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। ৭ মাস পর পুনরায় স্বস্থানে ফিরে আসে লঞ্চঘাটের জেটি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বাসসকে বলেন, লঞ্চঘাট এলাকার সরকারি ভূমিতে আধুনিকমানের যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হবে। লঞ্চঘাটে এমন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে, যা দেখে সুরমা নদীর পাড় দিয়ে যাতায়াতকারীরা বলতে পারেন, এখানে সত্যিই ভালো কিছু করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ১ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র লঞ্চঘাট এলাকায় প্রায় ৩১ শতক সরকারি খাস খতিয়ানের জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে জেলা প্রশাসন।