শিরোনাম

আল সাদী ভূঁইয়া
ঢাকা, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ডিসেম্বর মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ৪৩ ব্যক্তির প্রায় ২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তালিকায় সালমান এফ রহমান, এস আলম, শেখ ফজলে নূর তাপস ও মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলমসহ বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের নাম রয়েছে।
দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক স্বাক্ষরিত এক নথি থেকে জানা যায়, গত মাসে মোট ৩৬টি নথিতে ৪৩ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সম্পদ ক্রোক, অবরুদ্ধকরণ ও রিসিভার নিয়োগ সংক্রান্ত আদালতের আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
২৩টি আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে দেশে ক্রোক করা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ হাজার ৮৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং অবরুদ্ধ আর্থিক সম্পদের মূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ক্রোক ও অবরুদ্ধ হওয়া মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৯৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
ব্যক্তিভিত্তিক সম্পদের বিবরণে জানা যায়, বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের ১ হাজার ৪৮৩ শতাংশ জমি ক্রোক এবং একটি ব্যাংক হিসাবে থাকা ৫৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫০ শতাংশ জমি ক্রোক করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১ হাজার ৬৯৪ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭৭৩ টাকা। এছাড়া তার ১০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩২ কোটি ৭৫ লাখ ৯৪ হাজার ৫০ টাকা এবং ৮৬টি ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩৯ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এস আলমের জব্দ ও অবরুদ্ধ সম্পদের মোট মূল্য ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার বেশি বলে প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
তালিকায় থাকা প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান হেফজুল বারী মোহাম্মদ ইকবালের ৬২ কোটি ৯৫ লাখ ২৯ হাজার ১০০ টাকা মূল্যের ২১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার এবং ২৪২ কোটি ৯০ লাখ ৮৭ হাজার ৬৯৬ টাকার ৩২১টি ব্যাংক পে-অর্ডার অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে জব্দ ও অবরুদ্ধ সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে আদালতের আদেশে দু’টি ফ্ল্যাট ক্রোক করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। একই সঙ্গে ১২০ দশমিক ৭ শতাংশ জমি ক্রোক করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৭ টাকা। এছাড়া ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে, যার স্থিতি প্রায় ৬৬ কোটি ৫৫ লাখ ৯২ হাজার ৭০০ টাকা। তার নামে ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের মোট মূল্য ৬৯ কোটির বেশি।
এছাড়া, আদালতের আদেশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের ১০টি ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ ১২ হাজার ৫৯৪ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০টি এফডিআর অবরুদ্ধ করা হয়েছে, যার স্থিতি প্রায় ৮ কোটি ৫৯ লাখ ৯৭ হাজার ২৯৮ টাকা। এতে তার নামে মোট অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
দুদক জানায়, এসব সম্পদ দুর্নীতি, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাও রয়েছে।
এদিকে দুদকের কন্ট্রোল রুম জানায়, ডিসেম্বর মাসে কমিশন ৫৭৯ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৫৬টি এফআইআর (এজাহার) দায়ের করেছে। একই সময়ে ২৩৪ জনের বিরুদ্ধে ৬২টি চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া নয়জনকে অব্যাহতি দিয়ে আটটি ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। ওই মাসে ১৩৮টি নতুন অনুসন্ধান শুরু করা হয় এবং ৫০টি সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামীতেও দুদকের এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপ পরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও রাষ্ট্রের অনুকূলে আনার লক্ষ্যে কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। এখানে দুদক ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয় বরং ব্যক্তির অপরাধ ও দুর্নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছে। সামনের দিনেও একইভাবে কাজ করে যাবে। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করছে দুদক।