বাসস
  ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৫:৫১

পোল্যান্ডে আইনি অনিশ্চয়তায় ইউক্রেনীয় পুরুষরা

ঢাকা, ১৪ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : পোল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া হাজারো ইউক্রেনীয় পুরুষ ক্রমেই নিম্নমুখী জীবনযাত্রা ও বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। আর দেশে ফিরলেই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরিত হওয়া ও মৃত্যুর ঝুঁকি।

সামরিক সমাবেশ এড়াতে প্রতিবেশী দেশ পোল্যান্ডে পালিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় পুরুষরা এখন যুদ্ধ ও রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে আইনি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

ওয়ারশ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

একদিকে পোল্যান্ড ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের বিষয়ে নীতি আরও কঠোর করছে। ১০ লাখের কাছাকাছি ইউক্রেনীয় শরণার্থীর আশ্রয়দাতা পোল্যান্ড মার্চ মাসে যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুতদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়। জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি নির্বাচিত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এরপর থেকে ইউক্রেনীয়দের জন্য কঠোর নিয়ম কার্যকর হয়েছে। ইউরোপের সবচেয়ে কঠোর অভিবাসন নীতির একটি অনুসরণকারী দেশটিতে এখন তাদের অন্য বিদেশিদের মতোই নিয়মের আওতায় থাকতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার হামলার পঞ্চম বছরে আরও বেশি পুরুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার জন্য কিয়েভ চাপ বাড়াচ্ছে।

ওয়ারশর উপকণ্ঠের একটি হোস্টেলে থাকা কিশোর দিমিত্রো দেশে ফিরতে চান।

১৮ বছর বয়সী দিমিত্রো এএফপিকে বলেন, ‘যদি পারতাম, এখনই ব্যাগ গুছিয়ে হেঁটেই ইউক্রেনে ফিরে যেতাম। কিন্তু সেখানে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’

ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলে নিজের শহর থেকে ১৭ বছর বয়সে তিনি চলে আসেন। দুই পক্ষের যুদ্ধক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। সেই যুদ্ধে পাঠানো হতে পারে— এই আশঙ্কায় তিনি দেশ ছাড়েন।

দিমিত্রো বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, ১৮ বছর হওয়ার আগে যদি দেশ না ছাড়ি, তাহলে আমার আর রক্ষা থাকবে না।’

এখন তিনি পোল্যান্ডের রাজধানীর বাইরে একটি হোস্টেলে থাকেন। সেখানে আরও প্রায় ১০০ ইউক্রেনীয় পুরুষ রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই কারখানা, গুদামঘর এবং পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঢাকা।

বর্ণবাদবিরোধী পোলিশ সংগঠন 'নেভার এগেইন'-এর প্রতিনিধি আনা তাতার বলেন, ‘এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের ওপর আঘাত হানছে। পোলিশ রাষ্ট্রের জন্য এটি গভীর লজ্জার বিষয়।’

যুদ্ধক্ষেত্র এড়িয়ে আসা পুরুষদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত। অতীতে পোল্যান্ড বলেছিল, তাদের সুরক্ষা দেওয়া উচিত নয়।

দিমিত্রোর একই হোস্টেলে থাকা ভলোদিমির তিন বছর আগে সামরিক সমাবেশ এড়াতে অবৈধভাবে পোল্যান্ডে প্রবেশ করেন।

অন্য অনেকের মতো ৫০ বছর বয়সী তিনিও এখন বসবাসের অনুমতির আবেদনের ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি উদ্বিগ্ন। কারণ এরপর কী হবে, তা কেউ জানে না।’

প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার পুরুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া ইউক্রেনও নিয়ম আরও কঠোর করছে।

পোল্যান্ডে কর্মরত ইউক্রেনীয় একটি আইন প্রতিষ্ঠানের সদস্য ভিক্টোরিয়া করঝোভা বলেন, মার্চ থেকে নিজেদের অবস্থান বৈধ করার বিষয়ে সহায়তা চাইতে আসা ইউক্রেনীয়দের সংখ্যা বেড়েছে।

'প্রাণ হারানোর ঝুঁকি'-
গত মাসে ইউরোপীয় কমিশন ২৩ থেকে ৬০ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় পুরুষদের অস্থায়ী সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে রাখার পরিকল্পনা ঘোষণা করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানায়, ইউক্রেনের অনুরোধেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে ইউক্রেনীয় অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আন্দ্রি গাইদুতস্কি মনে করেন, এর ফলে ইউক্রেনীয় পুরুষরা ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতির জন্য আরও বেশি আবেদন করবেন।

তিনি বলেন, ‘আগে মানুষ অর্থনৈতিক কারণে দেশ ছাড়ত। এখন অনেক পুরুষ জীবন বা স্বাস্থ্য হারানোর ঝুঁকির কারণে দেশ ছাড়ছেন।’

কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কার্পাথিয়ান পর্বতমালা অতিক্রম করেছেন। কেউ রোমানিয়ায় যেতে নদী সাঁতরে পার হয়েছেন। আবার কারও কাছে আইনগত ছাড় থাকায় তারা ইউক্রেন ছাড়তে পেরেছেন।

তাদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে কিয়েভের একটি সিদ্ধান্ত। গত বছর থেকে বিদেশে থাকা পুরুষদের সামরিক নথি হালনাগাদ না করলে কনস্যুলার সেবা দেওয়া হচ্ছে না। সামরিক সমাবেশের আশঙ্কায় অনেকেই এ কাজ এড়িয়ে চলছেন।