বাসস
  ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৭:০০

রাশিয়ার সঙ্গে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে আর্মেনিয়ার এপ্রিকট

ঢাকা, ১৪ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : আর্মেনিয়ার আরারাত উপত্যকায় বাইবেলে উল্লেখিত আরারাত পর্বতের পাদদেশে খুবানি ফল বা এপ্রিকট পেকে উঠছে। তবে কৃষক আরামাইস কাজারিয়ানের চাষ করা ফলটি এখন রাশিয়া ও পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে।

৭৫ বছর বয়সী কাজারিয়ান তার গ্রামের বাগানে হাঁটার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তুরস্ক সীমান্তের ওপারে তুষারঢাকা আরারাত পর্বত থেকে আসা বাতাস গ্রীষ্মের তাপ কিছুটা কমিয়ে দেয়।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এপ্রিকট আর্মেনিয়ার প্রতীক।’

তিনি বলেন, ‘এর স্বাদ ও সুগন্ধ রাজকীয়। এপ্রিকট বিস্ময়েরও বিস্ময়।’

মস্কো থেকে ইয়েরেভানের সরে যাওয়ার নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে ক্রেমলিন আর্মেনিয়ার ফল, সবজি ও ফুলসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ আরোপ করে। 

আর্মেনিয়ার ভস্কেতাপ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

রাশিয়া বলেছে, অনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাপকভাবে মনে করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাকে আবার মস্কোমুখী করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কয়েক হাজার বছর ধরে চাষ হওয়া আর্মেনিয়ার বিখ্যাত এপ্রিকটকে প্রাচীন রোমানরা ‘আর্মেনিয়ান আপেল’ নামে চিনত।

নিষেধাজ্ঞা জারির আগে এপ্রিকট রপ্তানির বেশিরভাগই যেত রাশিয়ায়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে ব্যক্তি মালিকানায় কৃষিজমি বণ্টনের সময় কাজারিয়ান তার বাগান গড়ে তোলেন।

পাঁচ বছরের মধ্যেই গাছে ফল ধরতে শুরু করে। এরপর সীমান্ত পেরিয়ে ট্রাকে করে ফলের বড় অংশই রাশিয়ায় পাঠানো হতো।

রাশিয়া আর্মেনিয়ার মাছ, বিখ্যাত জেরমুক মিনারেল ওয়াটার, ওয়াইন ও ব্র্যান্ডির ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

এ সিদ্ধান্তে কাজারিয়ান ও তার মতো অনেক কৃষক ক্ষুব্ধ।

তিনি বলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে এই বাণিজ্য চলেছে। হঠাৎ করেই সব বদলে গেল?’

তার অভিযোগ, ইউরোপমুখী নীতির কারণে মস্কো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে শাস্তি দিচ্ছে। অথচ রাশিয়া ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা বলে।

তিনি আরও বলেন, ‘এটি পাশিনিয়ান বা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নয়। এটি আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে।’

মস্কোর তীব্র চাপ ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ সত্ত্বেও ৭ জুনের নির্বাচনে পাশিনিয়ানের দল জয়ী হয়। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানাননি। মস্কো নির্বাচনে কথিত অনিয়মের অভিযোগও তুলেছে।

বাণিজ্যযুদ্ধ-
সাবেক সোভিয়েতের অংশ আর্মেনিয়ার সঙ্গে মস্কোর আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক এখনও ঘনিষ্ঠ। দেশটি রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সদস্য এবং দেশটিতে রাশিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে।

তবে বিতর্কিত কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে আজারবাইজানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে রাশিয়া হস্তক্ষেপ না করায়, পাশিনিয়ান ইয়েরেভানের মস্কো নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেন।

আর্মেনিয়া মস্কোর নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা জোটে অংশগ্রহণ স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে এবং সম্ভাব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের পথে এগোচ্ছে।
মস্কোর শুরু করা এই বাণিজ্যযুদ্ধের ধাক্কা সামাল দিতে আর্মেনিয়া সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

জুনের শুরুতে কৃষকদের সহায়তায় একটি কর্মসূচি অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে গ্রিনহাউসে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানিতে ভর্তুকিও রয়েছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি হওয়া তাজা ফল, সবজি ও ফুলের ওপর আরোপিত শুল্কেরও ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সরকার।

ইউরোপীয় কমিশন তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে পাঁচ কোটি ইউরোর বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি আর্মেনিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ রপ্তানি পণ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪৫ কোটি ভোক্তার একক বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

নতুন বাজার খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলে আর্মেনিয়ার অর্থনীতি দুই শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মার্টিন গালস্তিয়ান।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আশোত আরামিয়ান বলেন, সরকারের পদক্ষেপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা সাময়িকভাবে ধাক্কা কমাতে পারবে।

তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আর্মেনিয়া প্রায় ২০ কোটি ডলারের তাজা ফল, সবজি ও ফুল রপ্তানি করেছে। এর ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশই গেছে রাশিয়ায়।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘সমগ্র ফলন ইউরোপ বা অন্য বাজারে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, এতে অতিরিক্ত উৎপাদন, দেউলিয়াত্ব ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে সরকারি কর্মকর্তারা আশাবাদী অবস্থান নিয়েছেনঅর্থমন্ত্রী গেভর্গ পাপোয়ান সংসদ সদস্যদের বলেন, ‘সেই সময় চলে গেছে, যখন আমরা বলতাম আর্মেনিয়ার পণ্য ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না।’
এপ্রিকট চাষি কাজারিয়ানও আশার কারণ দেখছেন।

তিনি বলেন, পাশের একটি গ্রামে ইতালীয় বিনিয়োগকারীরা বড় আকারের এপ্রিকট বাগান করেছেন। সেখান থেকে ইতালিতেও রপ্তানি শুরু হয়েছে।

তবে অনেক কৃষক উদ্বিগ্ন। তাদের প্রশ্ন, ‘যে ফলের কোনো বাজার নাও থাকতে পারে, সেগুলোর কী হবে?’

কাজারিয়ান বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একটি এপ্রিকট গাছ থেকে ৫০০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন আমরা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর দিকেই নজর দিয়েছি। কারণ রাশিয়া ছিল আমাদের জন্য এক অশেষ বাজার।’

তার মতে, বিকল্প বাজারে জায়গা করে নিতে আর্মেনিয়ার কৃষকদের উৎপাদনের পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গুণগত মান।’