বাসস
  ০৮ জুলাই ২০২৬, ২১:২৭

সুর নরম করে ইতিবাচক বার্তায় ন্যাটো সম্মেলন শেষ করলেন ট্রাম্প

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের বিরুদ্ধে নিজের সামরিক অভিযানে সমর্থন না দেওয়ায় ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুর নরম করে তাদের প্রতি আন্তরিক সমর্থন প্রকাশ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ইতিবাচক পরিবেশে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিরূপ অবস্থান থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবে ফিরে আসা ট্রাম্পের আচরণ তার বহুল আলোচিত অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক শৈলীরই আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আঙ্কারা থেকে এএফপি জানায়, ৩২টি সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি ছিল দারুণ একটি বৈঠক। কক্ষে অনেক আন্তরিকতা ছিল, ছিল ঐক্যের চেতনা।’

বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, রুদ্ধদ্বার আলোচনায় ট্রাম্প মিত্রদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা আপনাদের সঙ্গেই থাকতে চাই।’ অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো জোটে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায় সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায়। সেখানে ন্যাটো নেতারা জোটের চুক্তির অনুচ্ছেদ-৫-এ বর্ণিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের প্রতি তাদের ‘অটল প্রতিশ্রুতি’ পুনর্ব্যক্ত করেন।

ঘোষণায় বলা হয়, ‘এক সদস্যের ওপর হামলা মানেই সবার ওপর হামলা।’ এই ভাষার মাধ্যমে ন্যাটোর প্রতি ওয়াশিংটনের অঙ্গীকার নিয়ে মিত্রদের উদ্বেগ প্রশমনের চেষ্টা করা হয়েছে।

দিনের শুরু ছিল উত্তেজনাপূর্ণ

তবে দিনের শুরুটা ছিল ভিন্ন। সম্মেলনের মূল অধিবেশন শুরুর আগে ট্রাম্প ইরানবিরোধী অভিযানে ন্যাটো মিত্রদের সমর্থন না দেওয়ার সমালোচনা করেন। তিনি স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করার হুমকি দেন এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিজের আগ্রহও পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি ন্যাটোর ওপর খুবই অসন্তুষ্ট... গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে তারা যা করেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আমাদের সহায়তা না করায়।’

রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বদলে যায় অবস্থান

তবে বৈঠকে সরাসরি অন্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার পর ট্রাম্পের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় বলে জানান বৈঠকে উপস্থিত ওই সূত্র।

তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রকাশ্যে যা বলেন এবং বৈঠকের ভেতরে যা বলেন—দুটির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।’

ইরান নিয়েও ট্রাম্পের ভাষা তুলনামূলক সংযত ছিল। বৈঠকের আগে তিনি ইরানকে ‘আবর্জনা’ এবং ‘হিংস্র ও সহিংস মানুষ’ বলে আখ্যায়িত করলেও, বৈঠকের ভেতরে তার বক্তব্য ছিল অনেক কম কঠোর।

এছাড়া, বৈঠকের পর তিনি স্পেন বা গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গও আর তোলেননি।

এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিখালও বলেন, বৈঠকে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল অনেক বেশি গঠনমূলক।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘তিনি মূলত এই বার্তাই দিয়েছেন যে ইউরোপকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে এবং প্রতিরক্ষায় বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। পরিবেশ ছিল ইতিবাচক এবং আলোচনাও ছিল গঠনমূলক।’ 

লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেস্তুতিস বুদ্রিস বলেন, ট্রাম্পের প্রকাশ্য মন্তব্যকে ন্যাটো জোটের দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, এতে ন্যাটো দুর্বল হচ্ছে বা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা উচিত হবে না।’

ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সুযোগ

ইউক্রেন যুদ্ধও সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল।

সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইউক্রেনকে ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র নিজ দেশে উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়া হবে।

তিনি জেলেনস্কিকে বলেন, ‘আমরা আপনাদের প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দেব। এটা দারুণ ব্যাপার, তাই না?’

রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির কারণে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী চাপে রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার গভীরে হামলা চালানো এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান স্থিতিশীল করার মাধ্যমে ইউক্রেন পরিস্থিতি বদলে দিতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

তিনি বলেন, ‘এটি উত্তেজনা বাড়ালেও, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সহায়ক হতে পারে।’ একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে জেলেনস্কি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—উভয়েই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চান।

সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় ইউরোপ ও কানাডা ২০২৬ ও ২০২৭ সালে প্রতি বছর ‘৭০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার)’ সামরিক সহায়তা ইউক্রেনকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক

আঙ্কারা ত্যাগের আগে ট্রাম্পের সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে বৈঠকেরও কথা রয়েছে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

‘ট্রাম্পের জন্য বড় সাফল্য’

যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে নিজের সামরিক ভূমিকা কমিয়ে আনতে চাওয়ায় এবং সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবিতে অনড় থাকায় ৭৭ বছর বয়সী ন্যাটো জোটের জন্য এ সম্মেলন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে মঙ্গলবার ন্যাটো সদস্যরা কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের নতুন অস্ত্র ক্রয়চুক্তি ঘোষণা করে, যা প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের অংশ।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও তুরস্কের এ সম্মেলনের পর জোট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

তার ভাষায়, ‘আমি সব সময় মনে করি, যে পরিবারে কখনও খোলামেলা আলোচনা হয়, কখনও কিছুটা মতবিরোধও হয়—সেই পরিবারই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়।’