শিরোনাম

ঢাকা, ৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর অর্থনৈতিক অগ্রগতিও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বুধবার ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আবারও কমিয়েছে।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ০ শতাংশ, যা এপ্রিল মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসের ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কম। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা শুরুর আগেই এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়।
এটি চলতি বছরে দ্বিতীয়বারের মতো আইএমএফের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস হ্রাস। নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের তুলনায়ও কিছুটা কম হবে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এ বছর ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
তবে আইএমএফ বলছে, এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক গতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কিছু নেতিবাচক প্রভাব প্রশমিত করায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে।
সংস্থাটি ২০২৭ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
আইএমএফের গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডেনিজ ইগান এএফপিকে বলেন, আগামী দুই বছরের জন্য সংস্থার সম্মিলিত পূর্বাভাস মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তিনি সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারকে ‘ভি-আকৃতির পুনরুদ্ধার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি এসব কারণে চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আইএমএফ জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রভাব দেশভেদে ভিন্ন।
সংস্থাটির মতে, সংঘাতের বাইরে থাকা জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো বাণিজ্যিক সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতিগুলো, জ্বালানি আমদানিনির্ভর হলেও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
কিন্তু যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রযুক্তি মূল্যশৃঙ্খলে সীমিতভাবে যুক্ত, সেসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জেরে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের একটি অস্থায়ী সমঝোতার ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় তেল ও গ্যাস পরিবহন আংশিকভাবে স্বাভাবিক হয়। তবে বর্তমানে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে।
ইরানের সাম্প্রতিক হামলার আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইগান আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭ সালের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
দেশভেদে বড় বৈষম্য
আইএমএফ বলেছে, যুদ্ধের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে সামাল দিলেও দেশভেদে পরিস্থিতির পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
যুদ্ধ শুরুর পর উদীয়মান এশিয়ার দেশগুলোতে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যেখানে লাতিন আমেরিকায় তা বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
মার্কিন অর্থনীতি এ বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে ধারণা করা হলেও, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ০ দশমিক ৭ শতাংশে** নামিয়ে আনা হয়েছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই এই সংশোধন করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধারের আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে। ফ্রান্সের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ০ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কম।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধের পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
কৌশলগত জ্বালানি মজুত থেকে সরবরাহ দেওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এলেও, সামনে আরও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে পণ্যমূল্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে, সরবরাহব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান বিভাজন আরও ত্বরান্বিত হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।
তবে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে বলে আইএমএফ উল্লেখ করেছে।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া**—এই চারটি এআই-সম্পর্কিত হার্ডওয়্যারের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ যুদ্ধজনিত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইগান বলেন, চলতি বছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও এটি মূল্যস্ফীতি হ্রাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সমাপ্তি নয়, বরং একটি সাময়িক বিরতি মাত্র।