বাসস
  ০৮ জুলাই ২০২৬, ২০:১১

ন্যাটো সম্মেলনের শুরুতে মিত্রদের ওপর ট্রাম্পের তোপ

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার আঙ্কারায় শুরু হওয়া ন্যাটো সম্মেলনে মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট উত্তেজনা এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনকে ছাপিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আঙ্কারা  থেকে এএফপি জানায়, রাতভর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে’। একই সঙ্গে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সমর্থন না দেওয়ায় ন্যাটোর মিত্রদেরও কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন।

তিনি আবারও বলেন, তিনি এখনও গ্রিনল্যান্ড চান এবং এ বিষয়ে ইউরোপের বিরোধিতাকে তিনি ‘বড় সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ন্যাটোর ওপর আমি খুবই ক্ষুব্ধ... কারণ তারা গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে যা করেছে এবং বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আমাদের সহায়তা করতে চায়নি।’

তিনি বিশেষভাবে স্পেনের সমালোচনা করে দেশটিকে ন্যাটোর ‘ভয়াবহ অংশীদার’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, ‘স্পেন পণ্ডশ্রম। আমরা আর স্পেনের সঙ্গে কোনো ধরনের বাণিজ্য করতে চাই না।’ একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে মাদ্রিদের সঙ্গে চলমান বিরোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে স্পেনের ক্ষেত্রে ‘সবকিছু বন্ধ করে দিতে’ বলেন।

ট্রাম্প আবারও ন্যাটোভুক্ত দেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের প্রতি নিজের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের জন্য একটি বড় বিষয়। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেনমার্কের এতে কোনো উপকার নেই, কিন্তু আমাদের রয়েছে।’

এর আগে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ট্রাম্পের আগের দিনের মন্তব্যের জবাবে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড অবশ্যই বিক্রি হবে না।’

মিত্রদের উদ্বেগ

এর আগে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে উদ্বিগ্ন মিত্র দেশগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, সামরিক জোটটির প্রতি ওয়াশিংটনের ‘পূর্ণাঙ্গ অঙ্গীকার’ রয়েছে এবং মিত্ররা ট্রাম্পের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মঙ্গলবার তুরস্কে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রশংসা করেন এবং তাদের মধ্যে ‘দারুণ বোঝাপড়া’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি তার দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বিপরীতে এই বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী।

৭৭ বছর বয়সী এই ট্রান্স-আটলান্টিক সামরিক জোটের জন্য সম্মেলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেদের ভূমিকা কমিয়ে আনতে চাওয়ায় ট্রাম্প সদস্য দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিয়ে আসছেন।

মূল অধিবেশনের আগের দিন ন্যাটো জানায়, ২০২৬ সালে ইউরোপের মূল প্রতিরক্ষা ব্যয় ১১ শতাংশ বেড়ে ৬৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ৫৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

ট্রাম্পের সঙ্গে নতুন কোনো বিরোধ এড়াতে মঙ্গলবার ন্যাটো সদস্যরা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের নতুন অস্ত্রচুক্তি ঘোষণা করেছে।

রুটে বুধবার বলেন, ‘গতকাল ছিল দারুণ সফল একটি দিন।’ তিনি বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার হুমকির মুখে নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, ‘এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য একটি বড় বিজয়।’

ন্যাটো যখন ট্রাম্পের দৃষ্টি সদস্য দেশগুলোর বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিকে রাখতে চাইছে, তখন অচলাবস্থায় থাকা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টাও আবার আলোচনায় উঠে এসেছে। ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যুদ্ধরত উভয় পক্ষই সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় তারা উভয়েই একটি চুক্তি করতে চায়।’

বুধবার ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করবেন।

আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় তুরস্কে যাওয়ার আগে ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি পুতিনের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করবেন।

ইউরোপ ও কানাডা ২০২৬ ও ২০২৭—উভয় বছরেই ইউক্রেনকে বছরে ৭০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার) সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে যাচ্ছে।

ট্রাম্প সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গেও বৈঠক করবেন। বহু বছরের গৃহযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এই বৈঠকের একদিন আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁকে রাষ্ট্রীয় সফরে স্বাগত জানান। তবে রাজধানী দামেস্কে জোড়া বোমা হামলায় ১৮ জন আহত হওয়ায় সেই সফর আংশিকভাবে ম্লান হয়ে যায়।

ইরান সংঘাতের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারে কিছু মিত্র দেশের আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে ট্রাম্প এখনও অসন্তুষ্ট হলেও তিনি এরদোয়ানের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দেন। তিনি বলেন, তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করতে পারেন।

রাশিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে ২০১৯ সালে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে তুরস্ককে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে দেশটি পুনরায় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলোও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।