বাসস
  ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪২
আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৮:১০

ন্যাটো সম্মেলনের আগের দিন কিয়েভে রাশিয়ার হামলায় নিহত ১৪

ঢাকা, ৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের আগের দিন সোমবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে চালানো এ হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

হামলার পর প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে ন্যাটোর প্রতি ‘জোরালো সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কয়েক দিন আগেই রাশিয়ার আরেক হামলায় কিয়েভে ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। কিয়েভ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও বলেছে, ইউক্রেনের জন্য অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জরুরি প্রয়োজন।

সোমবার সকালের হামলায় কিয়েভের একটি বহুতল আবাসিক ভবনে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। ভবনটির ওপরের কয়েকটি তলা দুই ভাগে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

রাতের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতার সময় এএফপির সাংবাদিকরা ১০টিরও বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। বিস্ফোরণের সময় আকাশে একাধিক আলোর ঝলকানিও দেখা যায়।

এক সপ্তাহের মধ্যে এটি দ্বিতীয় হামলা, যেখানে রাশিয়া প্রতিহত করা কঠিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর পরই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরও উন্নত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের নতুন আহ্বান জানিয়েছেন জেলেনস্কি।

মঙ্গলবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় শুরু হওয়া ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন জেলেনস্কি।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের ইউরোপীয় অংশীদারদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো আঙ্কারা ন্যাটো সম্মেলন থেকে আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় জোরালো সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে আসা।’

জেলেনস্কি জানান, কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ৬০ জন।
তিনি বলেন, রাশিয়া ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫১টি হামলাকারী ড্রোন ছুড়েছে।

কিয়েভের উপকণ্ঠের ভিশনেভে এলাকার কর্মকর্তারা জানান, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থাকতে পারে। তাই সেখানকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

‘বড় ধরনের হামলা’
রাজধানীর উত্তরাঞ্চলের পোদিলস্কি জেলার বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক রুশ হামলাগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল তাদের এলাকা।

পাশের একটি ভবনের বাসিন্দা ৬৮ বছর বয়সী ওলেক্সান্দর বাকলুখভ এএফপিকে বলেন, ‘রাত দেড়টার দিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের অভিঘাতে সব জানালার কাচ ভেঙে যায়। এরপর আরও তিনবার আঘাত হানে।’

তিনি বলেন, ‘চারদিকে কাচ উড়ে পড়ছিল। আমাদের ফ্ল্যাটের একটি কাচও অক্ষত ছিল না।’
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের কয়েকটি অঞ্চলে সামরিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘বড় ধরনের হামলা’ চালিয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, কিয়েভে প্রায় ৩০টি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা পরও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন।

জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুত নেই।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেন, এই হামলা আবারও প্রমাণ করেছে যে ইউক্রেনের জরুরি ভিত্তিতে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। ন্যাটো সম্মেলনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।

রাশিয়ার সেনাবাহিনী জানায়, তাদের বাহিনীও রাতে ইউক্রেনের ৫০০টির বেশি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন রাষ্ট্র সমর্থিত ম্যাক্স প্ল্যাটফর্মে জানান, ইউক্রেনের কয়েক দফা ড্রোন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর দিকে এগিয়ে আসে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রেমলিনের যুদ্ধ সক্ষমতা দুর্বল করতে রাশিয়ার অভ্যন্তরের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা জোরদার করেছে ইউক্রেন। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।

গত সপ্তাহে রাশিয়া কিয়েভের আবাসিক ভবনগুলোতে হামলা চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করার পর উভয় পক্ষই নতুন করে হামলার ঘোষণা দিয়েছিল। নিহতদের মধ্যে পুরো পরিবারও ছিল।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নেওয়া কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন পর্যন্ত কোনো ফল দেয়নি।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার লক্ষ্যে ন্যাটো সম্মেলনের সময় বুধবার ট্রাম্প জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনার জন্যই প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। এটি দীর্ঘদিন ধরেই তার অগ্রাধিকার।’

তিনি আরও বলেন, এরপর ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

ক্রেমলিন প্রধান পুতিন এখনো তার কঠোর আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক দাবিগুলো থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ইউক্রেন এবং তার মিত্ররা বলছে, এসব দাবি মূলত আত্মসমর্পণের শর্তের সমান।

এদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার সেনাবাহিনী গত সপ্তাহে পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত শহর কোস্তিয়ানতিনিভকা দখলের দাবি করেছে। তবে জেলেনস্কি বলেছেন, ওই ঘাঁটি রক্ষায় ইউক্রেনীয় বাহিনী এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।