বাসস
  ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৪:৪৯

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির শেষযাত্রায় লাখো মানুষের ঢলের প্রত্যাশা

ঢাকা, ৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষযাত্রায় সোমবার তেহরানে লাখো মানুষের সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে তার পূর্বসূরির জানাজা ও দাফনে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার বিশেষ সতর্ক রয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দুই দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয় খামেনির মরদেহ। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাব্যাপী তার শেষযাত্রা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে।

তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় প্রায় ১ কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিল।

তখন জনতার চাপে পদদলিত হয়ে ১০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং আহত হন ১০ সহস্রাধিক।

রোববার হাজারো মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় গিয়ে আলী খামেনি ও তার পরিবারের চার সদস্যের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ইসরাইলি বিমান হামলায় তারা সবাই নিহত হন।

পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে মরদেহের কফিন ও জনতার মধ্যে বিশাল কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে আলাদা ব্যবস্থা করা হয়।

শেষযাত্রার সময় সাধারণ মানুষ কতটা কাছে যেতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ১৯৮৯ সালের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই সতর্ক রয়েছে কর্তৃপক্ষ। সে সময় শোকাহত জনতা খোমেনিকে বহনকারী যানবাহন ঘিরে ফেলায় তার কাফনের কাপড় ছিঁড়ে যায় এবং মরদেহ মাটিতে পড়ে যায়। পরে তাকে হেলিকপ্টারে করে দাফনের স্থানে নেওয়া হয়।

সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব দেওয়া আলী খামেনিকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর নিজেদের দৃঢ় অবস্থানও তুলে ধরতে চায় ইরানের কর্তৃপক্ষ।
মোজতবার অনুপস্থিতি-

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ, যিনি আলী খামেনি-পরবর্তী সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘গর্বিত ও অদম্য ইসলামী ইরানে জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে।’

সোমবারের শেষযাত্রার পর মঙ্গলবার ধর্মীয় নগরী কোমে, বুধবার ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় একই ধরণের অনুষ্ঠান হবে। এরপর বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের নিজ শহর মাশহাদে আলী খামেনিকে দাফন করা হবে।

রোববারের অনুষ্ঠানে আলী খামেনির তিন ছেলে বিরলভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হন। তবে তার ছেলে মোজতবা খামেনি ছিলেন না। বাবার নিহত হওয়ার পরপরই তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হলেও তিনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি।
কর্মকর্তারা জানান, বিমান হামলায় তিনি আহত হয়েছেন। তবে তার আঘাত কতটা গুরুতর, তা এখনো জানা যায়নি।

শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নতুন কমান্ডার আহমাদ বাহিদিও রোববার দ্বিতীয়বারের মতো শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তার পূর্বসূরি নিহত হওয়ার পর পুরো যুদ্ধকালেই তিনি জনসমক্ষে ছিলেন না। এবার তাকে খোলা জায়গায় দেখা গেছে।
আইআরজিসির বৈদেশিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি-ও বিরলভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হন।

ইরানি কর্তৃপক্ষ ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের জীবিত কোনো পূর্বসূরিকে এখন পর্যন্ত এসব অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। তাদের সবার সঙ্গেই আলী খামেনির সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল।

‘প্রতিশোধ চাই’-

গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি। সেই বিক্ষোভ কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের প্রতি জনসমর্থন তুলে ধরতেও এই ব্যাপক জনসমাগমকে গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানÑউভয়ই প্রয়োজন হলে আবার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। তাই শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানগুলোতে প্রতিশোধের দাবিও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

রোববারের প্রার্থনা অনুষ্ঠানে ৩৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যিনি নিজের পদবি মিরেমাদি বলে পরিচয় দেন, এএফপিকে বলেন, ‘খামেনির হত্যাকারীদের অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।’

৩৯ বছর বয়সী এক নারী, যিনি নিজের পদবি বাকান্দ বলে জানান, বলেন, ‘আমরা আমাদের বিপ্লব ও নেতার পাশে আছি। আমাদের প্রিয়জনদের রক্তের প্রতিশোধ চাই।’

আলী খামেনি দীর্ঘদিন পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতের নীতি অনুসরণ করেছেন। তেহরান বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহও রয়েছে। উভয় সংগঠনই শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে।