শিরোনাম

ঢাকা, ৫ জুন, ২০২৬ (বাসস) : ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলে সম্প্রতি ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় লড়ছেন দেশটির কবিরাজরা। দেশটির অনেকের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা থাকলেও ভেষজ উপাদান ও প্রথাগত নানা উপায়ে কবিরাজরা রোগীদের আস্থা অর্জনে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
ডিআর কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে বুনিয়া শহরের কবিরাজ মরিয়ম কাবিকা নিজের বাগানে ভেষজ উপাদান খুঁজছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ইউক্যালিপটাস, অ্যাভোকাডো, আম ও পেঁপের পাতা খুঁজছি।’
ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় মরিয়ম কাবিকার মতো লোকজ কবিরাজরা ইউক্যালিপটাস, অ্যাভোকাডো, আম ও পেঁপে পাতাসহ বিভিন্ন ভেষজ উপাদান ব্যবহার করছেন।
বিশাল আয়তনের দেশটির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ইতুরি খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও দরিদ্র। কয়েক দশকের সংঘাতে বিধ্বস্ত এ অঞ্চলে সরকারি সেবার উপস্থিতি খুবই সীমিত।
গত ১৫ মে ঘোষিত ইবোলা প্রাদুর্ভাবটি মধ্য আফ্রিকার দেশটির ১৭তম প্রাদুর্ভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ইবোলা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীরা এলাকায় পৌঁছালে প্রায়ই স্থানীয় জনগণের অবিশ্বাসের মুখে পড়েন। অন্যদিকে স্থানীয়দের আস্থাভাজন লোকজ চিকিৎসকেরা রোগটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন। ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ ও আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা বমির মতো শরীরের তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এটি ছড়ায়।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলার কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে কাবিকা ও তার স্বামী দাউদা শিমাঙ্গা দাবি করেন, তারা এর চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।
খড়ের ছাউনি দেওয়া একটি কুঁড়েঘরে তাদের চিকিৎসাকেন্দ্র। সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে তাবিজ, অশুভ আত্মা তাড়ানোর সুগন্ধি এবং ভেষজ ওষুধ। তারা বলেন, এটি তাদের ‘পূর্বপুরুষদের গবেষণাগার।’
শিমাঙ্গা বলেন, ‘আমাদের তৈরি ভেষজে রোগী সুস্থ না হলে আমরা তাকে এই গবেষণাগারে আনি। এরপর আত্মাদের ডাকি এবং পূর্বপুরুষদের সাহায্য চাই।’
শিমাঙ্গার দাবি, সেদ্ধ করা বিভিন্ন গাছের নির্যাসের বাষ্প দিনে তিনবার, টানা তিন দিন গ্রহণ করলে ইবোলা থেকে মুক্তি সম্ভব।
তিনি বলেন, সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবে এখনও কোনো রোগী এ চিকিৎসা নেননি। তবে আগের প্রাদুর্ভাবগুলোর সময় ‘রক্তক্ষরণ ও জ্বরে আক্রান্ত অনেক মানুষকে আমরা সুস্থ করেছি।
শিমাঙ্গা বলেন, এ রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে এখনও সনাতন চিকিৎসাকে যুক্ত করা হয়নি। তবে আমরা অবদান রাখতে প্রস্তুত।
ডিআর কঙ্গোতে এ ধরনের চিকিৎসকদের বলা হয় ‘ট্র্যাডি-প্র্যাকটিশনার’। পেশাটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত না হলেও এটি নিয়ন্ত্রিত এবং তাত্ত্বিকভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
পূর্ব কঙ্গোর বহু এলাকায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে বা একেবারেই নেই। সেখানে এ রোগকে প্রায়ই শত্রু, প্রতিবেশী, সহকর্মী বা আত্মীয়ের বিষপ্রয়োগের ফল বলে মনে করা হয়। ফলে মানুষ সাহায্যের জন্য লোকজ চিকিৎসকদের দ্বারস্থ হয়।
বুনিয়ার চিকিৎসক উইলি বেইজা বলেন,‘অনেক ইবোলা রোগী মনে করেন তারা বিষপ্রয়োগের শিকার হয়েছেন। তাই তারা ট্র্যাডি-প্র্যাকটিশনারদের কাছে যান, যারা মাত্রা বা তদারকি ছাড়াই ঐতিহ্যবাহী ওষুধ দেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এতে রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা বিলম্বিত হয়। রোগীদের অনেক সময় সংকটাপন্ন অবস্থায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা হয়।
গত সপ্তাহের শেষে বুনিয়া সফর করা ডব্লিউএইচও’র মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিশ্বাসের মাত্রা অনেক বেশি।
তিনি বলেন, কিছু সম্প্রদায়ের নেতা আমাকে বলেছেন, তারা বিশ্বাস করেন ইবোলা বলে কিছু নেই।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় অস্থির এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি অনীহাপূর্ণ এই দুর্গম অঞ্চলে কবিরাজরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ডব্লিউএইচও’র মতে, ইবোলার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং তাদের আচার-অনুষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
সংস্থাটি জানায়, গত বছরের এক ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সময় পূর্বপুরুষভিত্তিক সামাজিক রীতিনীতি স্থানীয় জনগণকে প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করতে সহায়তা করেছিল।
উদাহরণ হিসেবে, লোকজ কবিরাজরা সন্দেহভাজন রোগীদের আলাদা রাখার জন্য বিশেষ বিচ্ছিন্নকরণ আচার চালু করেছিলেন। পাশাপাশি মৃতদেহ ধোয়া ও মৃত প্রাণী সংগ্রহ নিষিদ্ধ করেছিলেন।
তবে বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার কার্যক্রম এখনও ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
ডব্লিউএইচও জানায়, সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা লোকজনের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৫ শতাংশকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা গেছে।
আফ্রিকায় ডব্লিউএইচওর জরুরি বিভাগের প্রধান মেরি রোজেলিন বেলিজেয়ার বলেন, ‘আমরা ট্র্যাডি-প্র্যাকটিশনারদের রোগীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠাতে অনুরোধ করছি। পাশাপাশি তাদের মধ্যে সুরক্ষা সরঞ্জাম বিতরণের কাজও চলছে।’