শিরোনাম

ঢাকা, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট এ সপ্তাহে এমন একটি বিল অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে ১৭ বছর বা তার কম বয়সীরা বৈধভাবে তামাকজাত পণ্য কিনতে পারবে না।
ইউরোপে এ ধরণের পদক্ষেপে এটিই প্রথম ও বিশ্বে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এ আইন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। নতুন এই যুগান্তকারী আইন সম্পর্কে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো।
লন্ডন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
-কী বলা হয়েছে আইনে?-
টোবাকো অ্যান্ড ভ্যাপস বিল অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০০৯ বা তার পরে জন্ম নেওয়া কেউ যুক্তরাজ্যে কখনোই সিগারেটসহ কোনো তামাকজাত পণ্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও কিনতে পারবে না।
আইনটি সরকারকে ভ্যাপের স্বাদ ও প্যাকেজিং সীমিত করার নতুন ক্ষমতা দিয়েছে। যেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ, সে সব স্থানে ভ্যাপিংও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ নিষেধাজ্ঞা শিশুদের খেলার মাঠ ও স্কুল সংলগ্ন এলাকাতেও বাড়ানো হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এ সব পণ্যে প্রায়ই নিকোটিন থাকে। বিভিন্ন স্বাদ ও আকর্ষণীয় রঙিন প্যাকেজিংয়ের কারণে তরুণদের মধ্যে এগুলোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
গত জুনে সরকার সস্তা ও একইভাবে বাজারজাত করা একবার ব্যবহারযোগ্য ভ্যাপ বিক্রি নিষিদ্ধ করে। নতুন বিলে সব ধরণের ভ্যাপ ও নিকোটিন পণ্যের বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
-কেন এ পরিবর্তন?-
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকসর (আইজিবিজিম) জানায়, ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৫৩ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ছিল, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ।
এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে ধূমপায়ীর সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলেও, এ অভ্যাস এখনো দেশটিতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান কারণ।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর এতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ মারা যায়।
স্বাস্থ্যবিষয়ক দাতব্য সংস্থা ‘অ্যাকশন অন স্মোকিং অ্যান্ড হেলথ’-এর জন্য গত বছর আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট-ভিত্তিক বাজার গবেষণা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স সংস্থা, ইউগভ-এর করা একটি জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক তামাক বিক্রির ওপর তথাকথিত প্রজন্মগত নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেন।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী হ্যাজেল চিজম্যান এই পদক্ষেপটিকে ‘প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এটি বর্তমানে ১৭ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তির জীবনকাল জুড়ে তামাকের বৈধ বিক্রি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যকে নির্দেশ করে।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী হ্যাজেল চিজম্যান এ পদক্ষেপকে ‘প্রতীকীভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বর্তমানে ১৭ বছর বয়সীদের জীবদ্দশায় তামাকের বৈধ বিক্রি ধীরে ধীরে বন্ধ করার লক্ষ্য প্রতিফলিত হয়।
‘এটি চিন্তাভাবনায় এক ধরনের পরিবর্তন।’
তিনি স্বীকার করেন, ভবিষ্যতে এই বয়সী গোষ্ঠীর মধ্যে ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তবে এর হার ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে’ বলে আশা প্রকাশ করেন।
- কবে কার্যকর হবে?-
পার্লামেন্টে অনুমোদিত বিলটি খুব শিগগিরই রাজকীয় সম্মতি পেলে আইন হিসেবে কার্যকর হবে।
এরপর বিভিন্ন বিধান ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কার্যকর হবে। কিছু বিষয়ে এখনো পরামর্শ প্রক্রিয়া চলছে।
২০০৮ সালের পর জন্ম নেওয়া তরুণদের কাছে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ হবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে, যখন তারা ১৮ বছরে পা দেবে।
এরপর প্রতি বছর তামাক কেনার ন্যূনতম বৈধ বয়স এক বছর করে বাড়ানো হবে। প্রথমে ১৯, পরে ২০Ñএভাবে চলতে থাকবে।
ত্তর ইংল্যান্ডের ৬৬ বছর বয়সী নার্স ক্রিস্টিন মেথনানি এ আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সহপাঠীদের চাপের কারণে কিশোররা আর কখনো ধূমপান শুরু করবে না।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি অনেক মানুষকে চিকিৎসাকেন্দ্রে দেখি, যারা ধূমপান ছাড়তে আসে। কিন্তু তারা কিশোর বয়সে চাপের কারণে এতে জড়িয়েছে।’
-কীভাবে বাস্তবায়ন হবে?-
ধূমপায়ীদের সরাসরি শাস্তি দেওয়া হবে না। তবে ২০০৮ সালের পর জন্ম নেওয়া কারো কাছে তামাক বা সংশ্লিষ্ট পণ্য, যেমন রোলিং পেপার বিক্রি করলে বিক্রেতাকে ২০০ পাউন্ড জরিমানা করা হবে।
আইনের বিরোধীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এতে কালোবাজার তৈরি হতে পারে।
তবে ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে-এর নীতিবিষয়ক ব্যবস্থাপক আলিজি ফ্রগেল এ যুক্তি খ-ন করেছেন।
তিনি বলেন, ’এর আগে তামাক নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিয়েও একই দাবি করা হয়েছিল, যা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।’
‘এটি শিল্পখাতের একটি সাধারণ যুক্তি। কিন্তু বারবারই তা ঘটেনি।’
তবে তিনি স্বীকার করেন, শিল্পখাত আইনটির বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ দিতে পারে। অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ধূমপানবিরোধী আইনেও তারা এমনটি করেছে।
- বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট কী?-
ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মালদ্বীপের পর বিশ্বে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে প্রজন্মভিত্তিক তামাক নিষেধাজ্ঞা চালু করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দ্বীপদেশ মালদ্বীপ গত নভেম্বর মাসে ১ জানুয়ারি ২০০৭-এর পর জন্ম নেওয়া তরুণদের কাছে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে।
ফ্রান্সে গ্রিন পার্টির আইনপ্রণেতা নিকোলাস থিয়েরি ২০১৪ সালের পর জন্ম নেওয়া সবার কাছে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধের একটি আন্তঃদলীয় বিল উত্থাপন করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই ও ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যেও এ ধরণের প্রস্তাব এসেছে।
নিউজিল্যান্ড এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক ছিল। দেশটি ২০০৮ সালের পর জন্ম নেওয়া সবার জন্য নিষেধাজনের পরিকল্পনা নেয়।
তবে ২০২৩ সালে ক্ষমতায় এসে মধ্য-ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টি আইনটি কার্যকরের আগেই তা বাতিল করে।