শিরোনাম

ঢাকা, ১১ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ভারত মহাসাগরের কৌশলগত চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে হস্তান্তরের ব্রিটিশ পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র বিরোধিতার পর এ সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাজ্য।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ডাউনিং স্ট্রিটের বরাতে নাইরোবি থেকে এএফপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন না থাকলে এই চুক্তি এগোবে না। এ অবস্থান আগেই সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছিল।
ট্রাম্প পূর্বে এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত বড় ধরনের ভুল’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার পর এ সিদ্ধান্ত কার্যত ‘ফ্রিজ’ অবস্থায় চলে গেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সূত্র।
ব্রিটেনের সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক সাইমন ম্যাকডোনাল্ড বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলে সরকারের জন্য চুক্তিটি এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে এটি আপাতত স্থগিত অবস্থায় চলে গেছে।
কৌশলগত দ্বীপ ও সামরিক গুরুত্ব
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের প্রধান দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শীতল যুদ্ধ থেকে শুরু করে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ, এমনকি সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতেও এটি সামরিক অভিযান পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ১৯৬০-এর দশকে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি লিজ চুক্তি করে, যার ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ব্যাপক আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
মরিশাসের দাবি ও আন্তর্জাতিক রায়
মরিশাস দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ব্রিটেন অবৈধভাবে তাদের ভূখ- ভাগ করেছে। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) মত দেয়, যুক্তরাজ্যের উচিত দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
তবে লন্ডন এ রায় প্রত্যাখ্যান করে, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কারণে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান নেয়।
২০২৫ সালে ব্রিটেন ও মরিশাস একটি চুক্তিতে পৌঁছায়, যেখানে দ্বীপগুলো ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ডিয়েগো গার্সিয়ায় সামরিক ঘাঁটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি লিজের পরিকল্পনা ছিল।
নতুন সংকট
এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে সেই চুক্তি স্থগিত হওয়ায় আবারও জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি দ্বীপপুঞ্জ নয়—ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে এই বিরোধ কয়েক দশকের উপনিবেশবাদ, বাস্তুচ্যুতি এবং কৌশলগত সামরিক স্বার্থের জটিল ইতিহাসকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
কৌশলগত ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের প্রধান দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, ব্রিটেন দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ডিয়েগো গার্সিয়ার সামরিক ঘাঁটি ৯৯ বছরের জন্য লিজে রাখার পরিকল্পনা করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন না থাকায় সেটি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
ব্রিটিশ বিরোধী দল এই সিদ্ধান্তকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে ডাউনিং স্ট্রিট বলছে, ঘাঁটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ইস্যুটি বহু দশকের পুরোনো উপনিবেশবাদ, আন্তর্জাতিক আইন এবং কৌশলগত সামরিক স্বার্থের জটিল দ্বন্দ্বকে ঘিরে রয়েছে।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ব্রিটেনকে দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানালেও লন্ডন তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
বর্তমান স্থগিতাদেশের ফলে এই দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক বিরোধ আবারও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।