বাসস
  ১৯ মে ২০২৬, ১৭:০৭

সুন্দরবন উপকূলে মৌচাষের ব্যাপক সম্ভাবনা 

ছবি: বাসস

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান

খুলনা, ১৯ মে ২০২৬ (বাসস): সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় মধু চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। এলাকার বিভিন্ন জমি ও নদী পাড়ে গড়ে উঠছে মৌ-বক্স ভিত্তিক মধু চাষ। একসময় যেখানে বননির্ভর মৌয়ালরা ঝুঁকি নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে মধু সংগ্রহ করতেন, এখন সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে মৌবাক্স বসিয়ে নিরাপদ ও টেকসই উপায়ে মধু উৎপাদনে ঝুঁকছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। 

সরেজমিনে দেখা যায়, নদী তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন যুবক ও কৃষক মৌবাক্স স্থাপন করে নিয়মিত মধু সংগ্রহ করছেন। বনে না গিয়েও সুন্দরবনের মধু আহরণ করা হচ্ছে। বিষয়টি ইতোমধ্যেই জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। 

মৌচাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মৌমাছিরা নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে অন্তত তিন কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। কয়েক দিন আগে তারা প্রায় তিন মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। এখন সুন্দরবনে কেওড়া ফুল ফোটা শুরু হওয়ায় উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

সাতক্ষীরা থেকে আসা মৌচাষিদের একটি দল বর্তমানে বানিয়াখালী গ্রামের নদীপাড়ে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। তাদের মোট ৪০০টি মৌ বাক্সের মধ্যে ১২০টি এখানে রাখা হয়েছে। তীব্র রোদ থেকে মৌমাছিকে রক্ষা করতে বাক্সগুলোর ওপর খড় ও চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

কয়রার সুন্দরবনসংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীর তীরেও একই চিত্র। সেখানে সারি সারি মৌবাক্স বসিয়ে কাজ করছেন মৌচাষিরা। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে মৌচাকের ফ্রেম ঘুরিয়ে মধু আলাদা করা হয়। পরে সেই চাক আবার বাক্সে ফিরিয়ে দিলে মৌমাছিরা নতুন করে মধু জমাতে শুরু করে।

শাকবাড়িয়া নদীর তীরের মঠবাড়ি গ্রামের একটি বাড়ির পেছনে কয়েকটি মৌবাক্স ঘিরে স্থানীয় নারী-পুরুষ ব্যস্ত সময় পার করছেন। মৌচাকের ফ্রেম বের করে ব্রাশ দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে মেশিনে বসিয়ে ঘুরিয়ে মধু আলাদা করা হচ্ছে।

মৌচাষি রিফাত হোসেন বলেন, ‘এগুলোই আমাদের মৌমাছির ঘর। সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুল থেকে ওরা মধু এনে এখানে জমা করছে। এখন আর আমাদের বনের ভেতরে যেতে হয় না। বনের পাশে বসেই মধু সংগ্রহ করছি।’

রিফাত জানান, তাদের ৪০০টি মৌবাক্স পরিচালনায় বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়। গত বছর তাদের আয় হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টাকা। তবে ফুলের মৌসুম না থাকলে মৌমাছিকে চিনি খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। প্রতিটি বাক্সে রাণী মৌমাছি থাকা জরুরি, না হলে শ্রমিক মৌমাছিরা অন্যত্র চলে যায়।

কয়রায় অবস্থিত বন বিভাগের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন বাসসকে বলেন, ‘এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমছে এবং মৌয়ালদের ঝুঁকিও হ্রাস পাচ্ছে।’

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বনে না গিয়েও সুন্দরবনের মধু আহরণের একটি নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প তৈরি হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের বনাঞ্চলের ফুল, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে বন সংলগ্ন এলাকায় উৎপাদিত মধুর মান ও স্বাদ অন্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন ও উৎকৃষ্ট। ফলে আধুনিক পদ্ধতির মৌ চাষিরা সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপকূলকেই মধু উৎপাদনের সুবিধাজনক জোন হিসেবে বেছে নিয়েছেন।