বাসস
  ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:৫৫

ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েও স্বাভাবিক জীবনে সৌদির আল-খার্জ শহর

ঢাকা, ৬ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : প্রজন্ম ধরে ক্লান্ত মানুষেরা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ছুটে আসতেন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কাছের এই মরুদ্যান শহরে। শান্ত বাতাস, তালগাছের ছায়া আর মিষ্টি খেজুর—সব মিলিয়ে শহরটি ছিল নগরজীবনের শান্তির ঠিকানা।

কিন্তু সেই শান্তির আল-খার্জ এখন আর আগের মত নেই। ইরানি হামলার সরাসরি নিশানায় পড়ে শহরটির নিরিবিলি পরিবেশ এখন টালমাটাল।

ধু ধু মরুভূমিতে  অসংখ্য খেজুর আর সারি সারি তালগাছের ছায়া ঢাকা সড়কের জন্য বিখ্যাত শহরটি প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির একেবারে গা ঘেঁষে অবস্থিত। সবুজ মাঠ আর বাগান যেন মরুভূমির সম্পূর্ণ বিপরীত।

গত মাসে মার্কিন গণমাধ্যম জানায়, এই ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় অন্তত এক ডজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। 

যদিও ইরানি কর্মকর্তারা পরে দাবি করেন, কয়েকশ’ কোটি ডলার মূল্যের একটি অত্যাধুনিক নজরদারি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। ওই হামলায় বেশ কয়েকটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও (এয়ারিয়াল রিফুয়েলিং প্লেন) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর একের পর এক পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশগুলোকে মার্কিন হামলার 'লঞ্চপ্যাড' বা উৎক্ষেপণ স্থল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলছে তেহরান।

তবে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যেও অনেকটাই নির্বিকার এই শহরের বাসিন্দারা।

ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আবদুল্লাহ এএফপিকে বলেন, ‘প্রতিরোধের বিকট শব্দ শুনি, কিন্তু আকাশে তেমন কিছু চোখে পড়ে না।’ নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্পর্শকাতরতার কারণে শুধু নিজের নামটুকু বলতে রাজি হন তিনি।

প্রথম বেসামরিক মৃত্যু
যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবে প্রথম বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে এই আল-খার্জেই। গত ৮ মার্চ একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে শহরে কর্মরত দুই প্রবাসী শ্রমিক নিহত হন।

গত সপ্তাহেও একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষ তিনটি বাড়িতে আঘাত করলে আহত হন দু’জন। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, একই ধরনের ঘটনায় আরও ছয়টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় মসজিদে আসরের নামাজ আদায় শেষে আবদুল্লাহ এএফপিকে বলেন, ‘আল-খার্জে এটা অস্বাভাবিক। তারপরও জীবন স্বাভাবিকভাবেই চলছে। কোনো পরিবর্তন নেই, আতঙ্কও নেই।’

ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস সৌদি আরবকে তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ ও এফ-১৬ মোতায়েন এবং বিমান সংরক্ষণ ও জ্বালানি সরবরাহের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছে।

ওয়াশিংটন ও রিয়াদের চুক্তির আওতায় ২০১৯ সালে মার্কিন বাহিনী পুণরায় সৌদি আরবে ফেরে। সে সময়ের গণমাধ্যম প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে কয়েকশ’ মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়।

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে এই ঘাঁটিই ছিল কমান্ড সেন্টার। পরে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আক্রমণের সময়ও সংক্ষিপ্তকালের জন্য একই কাজে ব্যবহৃত হয়। এরপর সব মার্কিন সেনা সৌদি আরব ছেড়ে চলে যায়।

সৌদি আরবে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি সবসময়ই দেশটির রক্ষণশীল মহলের একাংশের কাছে বিতর্কিত। ইসলামের দুটি পবিত্রতম স্থান সমৃদ্ধ দেশে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতিকে তারা ধর্মের অবমাননা হিসেবে দেখেন। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পরে কারণ হিসেবে এই বিষয়টির কথাও উল্লেখ করেছিলেন ওসামা বিন লাদেন।

যুদ্ধের খবরে চোখ
আল-খারজের শান্ত পরিবেশ প্রথম নজরে যুদ্ধকালীন অবস্থার ইঙ্গিত বহন করে না।

এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে কৃষি উৎপাদনের কেন্দ্র। সবুজ মাঠ আর ফলে ভরা বাগান। বিস্তীর্ণ মরুভূমির বুকে যেন অন্য এক জগৎ।

সম্প্রতি এএফপির পরিদর্শনে দেখা যায়, রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজের সময়ও গ্রাহকদের অনেকে মোবাইল ফোনে যুদ্ধের সর্বশেষ খবর দেখছিলেন।

সরকারি কর্মচারী তুর্কি বলেন, ‘আল-খারজ এখন সংবাদে। বন্ধুরা প্রতিটি হালনাগাদ খবর শুনে ফোন করে আমাদের খোঁজ নেয়।’

ইরান নিয়মিত হামলা চলালেও ঘাঁটির আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 
তবে বাসিন্দারা পরবর্তী হামলার শঙ্কায় থাকে সবসময়ই। হামলার সতর্কবার্তা নিয়ে ফোনে ঘন ঘন মেসেজ আসতে থাকে।

কালো নিকাব পরা ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী বাতুল স্থানীয় একটি ক্যাফেতে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে এএফপিকে বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে বা বিদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর খবর পেলে ভয় লাগে না, এটা বলব না।’

তবে এই নতুন বিপদেও ভয়ের কাছে মাথা নোয়াতে নারাজ বাতুল।

তার ভাষ্য, ‘দেখতেই পাচ্ছেন, আমি বাইরে বসে পড়াশোনা করছি। যুদ্ধের কারণে আমার রুটিন এতটুকুও বদলায়নি।’