বাসস
  ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:২১

‘অলৌকিক’ অভিযানে ইরানে আটক মার্কিন বিমানসেনা উদ্ধার : ট্রাম্প

ঢাকা, ৫ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার জানিয়েছেন, ইরানে ভূপাতিত হওয়া একটি যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় বিমানসেনাকে মার্কিন বাহিনী নিরাপদে উদ্ধার করেছে। তিনি এই অভিযানকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের অন্যতম’ বলে অভিহিত করেন।

অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, তারা এই উদ্ধার অভিযান ‘সম্পূর্ণভাবে নস্যাৎ’ করেছে। তবে তারা বিমানসেনাকে আটক করেছে এমন কোনো দাবি করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের তাকে উদ্ধার করার দাবিও সরাসরি অস্বীকার করেনি।

এই ঘোষণার সময়ই ট্রাম্প আবারও সতর্ক করে বলেন, সোমবারের মধ্যে ইরানকে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে, নইলে তাদের ওপর ‘নরক নেমে আসবে’।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ওই বিমানসেনা ‘ইরানের দুর্গম পাহাড়ে শত্রুদের মাঝে অবস্থান করছিলেন এবং শত্রুপক্ষ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।’

তিনি বলেন, ‘তিনি আহত হয়েছিলেন, তবে তিনি ভালো আছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই অলৌকিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানটি গতকাল আরেক সাহসী পাইলটকে সফলভাবে উদ্ধারের পর পরিচালিত হয়েছে, যা আমরা তখন নিশ্চিত করিনি, কারণ দ্বিতীয় উদ্ধার অভিযানকে ঝুঁকিতে ফেলতে চাইনি।’

বিমানবন্দর পরিত্যক্ত

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ওই বিমানসেনা একজন অস্ত্রব্যবস্থা কর্মকর্তা ছিলেন এবং তার কাছে একটি পিস্তল, একটি সংকেত ডিভাইস (বিকন) এবং উদ্ধারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি সুরক্ষিত যোগাযোগযন্ত্র ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তাকে এবং উদ্ধারকারী দলকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্ধারিত দুটি বিমান ইরানের একটি দূরবর্তী ঘাঁটিতে আটকা পড়ে যায় এবং সেগুলো যাতে ইরানের হাতে না পড়ে, সেজন্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

এরপর মার্কিন বাহিনী আরও তিনটি পরিবহন বিমান ব্যবহার করে ওই বিমানসেনা ও উদ্ধারকারী দলকে ইরান থেকে বের করে আনে।

ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এই অভিযানে ব্যবহৃত চারটি মার্কিন উড়োজাহাজ তারা ধ্বংস করেছে এবং দক্ষিণ ইসফাহান প্রদেশের একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই অভিযানের সময় হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রকাশিত ভিডিওতে মরুভূমিতে ছড়িয়ে থাকা একটি মার্কিন বিমানের পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ দেখানো হয়েছে, যেখান থেকে এখনো ধোঁয়া উঠছে।

ইরান বলেছে, তারা ওই যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করেছে যেখান থেকে ক্রুরা বেরিয়ে এসেছিল। তবে মার্কিন গণমাধ্যম কেবল জানিয়েছে, বিমানটি গুলি করে নামানো হয়েছিল।

মার্কিন প্রশাসন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বিমানটি ভূপাতিত হয়েছিল কি না।

অবকাঠামোয় হামলা

ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালীর নৌপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যা তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওমানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটি নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করতে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে।

সংস্থাটি জানায়, ‘উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও ধারণা তুলে ধরেছেন।’

রোববার উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলাও দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে। খুজেস্তান প্রদেশের উপ-গভর্নরের তথ্যমতে, শনিবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রে হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

‘মানুষ আতঙ্কিত’

ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী ইসরাইলকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে লেবাননও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

ইসরাইল পাল্টা হামলা চালিয়ে দক্ষিণ লেবাননে স্থলবাহিনী মোতায়েন করেছে।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন রোববার আবারও ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিনি গাজার মতো ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দক্ষিণাঞ্চলকে রক্ষা করতে চান।

লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের এক সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের কফর হাট্টায় ইসরাইলি হামলায় ছয় সদস্যের একটি পরিবার—যারা এলাকা ছাড়ার অপেক্ষায় ছিল—এবং তাদের নিতে আসা আরেক আত্মীয় নিহত হয়েছেন।

ইসরাইল সীমান্তের কাছে দক্ষিণাঞ্চলীয় ডেবেল গ্রামে বাসিন্দারা চারপাশে গোলাবর্ষণের শব্দের মধ্যেই ইস্টার সানডে উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গ্রামটি প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় বাসিন্দা জোসেফ আতিয়েহ ফোনে এএফপিকে বলেন, ‘মানুষ আতঙ্কিত।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখছি—কারণ এটিই একমাত্র আশা, যা আমরা ছাড়ব না।’

জেরুজালেমের পুরোনো শহরের সাধারণত প্রাণচঞ্চল গলিগুলো ইস্টার সানডেতে নীরব ছিল। যুদ্ধ ও পবিত্র সমাধিক্ষেত্রে (হলি সেপালকার) প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে উৎসবের পরিবেশ ম্লান হয়ে পড়ে।

ভ্যাটিকানে ইস্টার উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে পোপ লিও চতুর্দশ ‘যাদের যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা আছে’ তাদের শান্তি বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ‘হাজারো মানুষের মৃত্যুর প্রতি বৈশ্বিক উদাসীনতা’র সমালোচনা করেন।

বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্র

ইরানে শনিবার বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছে একটি হামলায় এক নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। আংশিকভাবে এই কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় সহায়তাকারী রাশিয়া ১৯৮ জন কর্মী সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং হামলাটিকে ‘একটি অশুভ কাজ’ বলে নিন্দা জানায়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত এই কেন্দ্রে হামলা অব্যাহত থাকলে তা তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা ‘তেহরান নয়, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে জীবন বিপর্যস্ত করে দেবে।’

বুশেহর ইরানের রাজধানীর তুলনায় কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি এক্সে লিখেছেন, সেখানে বিকিরণের মাত্রা বৃদ্ধির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এটি চতুর্থ হামলা হওয়ায় তিনি ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেন।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করার কয়েক সপ্তাহ পরও ইরান কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

রোববার ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানায়, ইরানে চলমান ইন্টারনেট বন্ধ এখন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের জাতীয় পর্যায়ের ব্ল্যাকআউট।