শিরোনাম

ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : কম্বোডিয়ার দাবি করা একটি সীমান্ত এলাকায় থাই সেনাদের বসানো মরচে ধরা হালকা সবুজ রঙের একটি শিপিং কনটেইনারে ঝোলানো সাইনবোর্ডে লেখা, ‘কম্বোডিয়ান নাগরিকদের এই এলাকায় প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’
একদিকে কাঁটাতারের কয়েল দিয়ে ঘেরা অস্থায়ী ব্যারিকেডের দুই পাশে দাঁড়িয়ে কম্বোডিয়ানরা তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানোর বেদনা প্রকাশ করছেন, আর অন্যদিকে থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী তাদের দখলকৃত এলাকা গণমাধ্যমের সামনে প্রদর্শন করছে।
গত বছর উভয় দেশের মধ্যে সংঘর্ষের সময় থাই বাহিনী সীমান্তবর্তী বিতর্কিত কয়েকটি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। থাই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই এলাকার পরিমাণ কয়েক বর্গকিলোমিটার হতে পারে।
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়ার সীমান্ত থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ কথা জানিয়েছে।
কম্বোডিয়ার নাগরিক কিম রেন এএফপি’কে বলেন, চৌক চেই এলাকার যে অংশ এখন থাইল্যান্ডের দখলে, তার বাড়ি সেখানেই ছিল।
তিনি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ডিসেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ব্যাংককের সামরিক বাহিনী তার বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, ‘থাইরা আমাদেরকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে। আমাদের আর কোনো আশাই নেই।’
উত্তরের দিকে থাই সেনারা একটি খননযন্ত্র পাহারা দিচ্ছিল। সেখানেই বান নং চান গ্রাম অবস্থিত। সৈন্যরা সেখানে ধ্বংসাবশেষ ট্রাকে তুলছিল।
সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম সফরের অংশ হিসেবে তারা এই আয়োজন করে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, কিম রেনসহ তার গ্রাম ও আরেকটি বিতর্কিত এলাকা প্রেই চান থেকে আসা ১ হাজার ২০০ জনের বেশি পরিবার কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছে।
চীনের অনুদান হিসেবে দেওয়া নীল রঙের তাঁবু মন্দির চত্বরে গাদাগাদি করে বসানো হয়েছে।
এই মন্দির সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। আশ্রয় প্রার্থীরা তড়িঘড়ি করে সামান্য যা উদ্ধার করতে পেরেছেন, তা নিয়েই এই নীল রঙের তাঁবুতে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন।
এখানে আশ্রয় নেওয়া কিম রেন বলেন, ‘থাই চোররা আমাদের সব কিছুই দখল করে নিয়েছে।’
রেন আরও বলেন, তিনি তার জমি, ৩০ হাজার ডলারের মুদি পণ্যের ব্যবসা ও ৫০ হাজার ডলারের বাড়ি— সবই হারিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে মাত্র ৪০ ডলার দিয়ে জমি কিনে, সেখানে বসতি গড়েছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এখানে এখনও মানুষ বাস করে।’
দুই দেশের শতবর্ষ পুরোনো সীমান্ত বিরোধের মূল কারণ ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তরেখা নিয়ে ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলের অস্পষ্ট মানচিত্র।
গত বছর এই বিরোধ একাধিক দফা সংঘর্ষে রূপ নেয়, যাতে সৈন্য ও বেসামরিকসহ বেশ কয়েকজন মানুষ নিহত হয় এবং জুলাই ও ডিসেম্বরে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
নম পেন জানিয়েছে, থাই বাহিনী সীমান্তবর্তী কয়েকটি প্রদেশের এলাকা দখল করেছে এবং তারা সেখান থেকে সরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে ব্যাংককের দাবি, তারা কেবল থাইল্যান্ডের ভূখণ্ড পুনর্দখল করেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে কম্বোডিয়ানদের দখলে ছিল।
থাই সামরিক সফরের অংশ হিসেবে ক্লং পেং গ্রামে থাই পতাকা উড়তে দেখা যায় এবং কাঁটাতার ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
থাই সেনাবাহিনীর মুখপাত্র উইন্থাই সুভারি বলেন, ডিসেম্বর মাসে ওই গ্রামে প্রায় ৬৪ হেক্টর জমি ‘পুনর্দখল’ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে এখনও মানুষ বাস করে, তাই খুব সতর্কভাবে অভিযান চালাতে হয়েছে।’
৬০ বছর বয়সী থাই কৃষক পংস্রি রাপান বলেন, গোলাবর্ষণে তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। একটি আলমারি ছাড়া আর কিছুই রক্ষা পায়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘তবে, আমি ভয় পাই না। কারণ, সেনাবাহিনী আমার আশেপাশে আছে।’
রাপান বলেন, তার ‘অনেক ভালো কম্বোডিয়ান বন্ধু’ রয়েছে এবং ‘আমাদের সেনারা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে— বিষয়টি আমার জন্য খুব কষ্টের।’
এক জ্যেষ্ঠ থাই কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, জমির বরাদ্দ চূড়ান্ত হলে সামরিক নিয়ন্ত্রণে আসা এই জমি থেকে থাই কৃষকরাই উপকৃত হবেন।
১৯৭৯ সালে গণহত্যাকারী খেমার রুজ শাসনের পতনের পর থাইল্যান্ড সীমান্ত এলাকায় কম্বোডিয়ান শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়। তাদের মধ্যে অনেক পরিবার পরবর্তীতেও সেখানে থেকে যায়।
মন্দিরের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ৬৭ বছর বয়সী কৃষক সক চর্ক বলেন, তিনি ১৯৮০ সালে প্রেই চান এলাকায় বসতি গড়েন। ওই সময়ে সেটি ল্যান্ডমাইনে ভরা একটি জঙ্গল ছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘যখন এটা ঘন জঙ্গল ছিল, তখন তারা বলত না যে এটা তাদের। কিন্তু কম্বোডিয়ানরা জঙ্গল পরিষ্কার করে কংক্রিটের বাড়ি বানানোর পর, তারা বলতে শুরু করল যে এটা তাদের জমি।’
চর্ক অভিযোগ করে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, থাইরা ‘আমাদের সব কিছু লুট করে নিয়ে গেছে।’
তার বাড়িও বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সেপ্টেম্বরে প্রেই চান এলাকায় কয়েকশ কম্বোডিয়ান কাঁটাতার সরানোর চেষ্টা করলে, থাই বাহিনী তাদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, এতে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ব্যারিকেডের অপর পাশে, যেখানে গ্রামের নাম বান ইয়া নং কায়েউ, সেখানে থাই পতাকা উড়ছে।
থাই নাগরিক অনুপং কাননংহা বলেন, গোলাবর্ষণে তার বাড়ি প্রায় সমতল হয়ে গেছে। বাড়িটির শুধু পোড়া ছাদ আর সিমেন্টের কাঠামোটুকুই অবশিষ্ট আছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কম্বোডিয়াই আমাদের সঙ্গে এটা করেছে। এটা ভাবতেই আমার খুব কষ্ট লাগে।’