শিরোনাম

ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : মানবিক সংস্থাগুলোর মাসব্যাপী আহ্বানের পর রোববার ইসরাইল বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ স্থলবন্দর আংশিকভাবে পুনরায় খুলে দিয়েছে। তবে আপাতত এ পথে কেবল মানুষের যাতায়াতই অনুমোদিত হবে।
রাফাহ থেকে এএফপি জানায়, এদিকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থার তথ্যমতে, শনিবার ইসরাইলি হামলায় সেখানে ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব হিসেবেই তারা ওই হামলা চালিয়েছে।
রাফাহ ক্রসিং বেসামরিক মানুষ ও ত্রাণ সহায়তা প্রবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। তবে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধে ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি বাহিনী ক্রসিংটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে এটি বন্ধ ছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে স্বল্প সময়ের জন্য সীমিত পরিসরে একবার এটি খোলা হয়েছিল।
ফিলিস্তিনি বেসামরিক বিষয়ক সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্থা কোগ্যাট রোববার জানায়, ‘আজ রাফাহ ক্রসিংটি কেবল বাসিন্দাদের সীমিত যাতায়াতের জন্য খোলা হয়েছে।’
হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ক্রসিং খুললে প্রায় ২০০ রোগী গাজা ছাড়ার অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে জানান, ‘ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০ জন ফিলিস্তিনি মিসর অংশে পৌঁছেছেন, যাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে এবং তারা সেখানে কাজ শুরু করবেন।’
এর আগে ইসরাইল জানিয়েছিল, গাজায় আটক থাকা শেষ ইসরাইলি জিম্মি রান গিভিলির মরদেহ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তারা রাফাহ ক্রসিং খুলবে না।
কয়েক দিন আগে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং বুধবার ইসরাইলে তাকে দাফন করা হয়। এর দুই দিন পর সিওগ্যাট ক্রসিং পুনরায় খোলার ঘোষণা দেয়।
সিওগ্যাট জানিয়েছে, ‘মিসরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে, ইসরাইল কর্তৃক ব্যক্তিদের পূর্বনিরাপত্তা যাচাই শেষে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিশনের তত্ত্বাবধানে প্রবেশ ও প্রস্থান অনুমোদিত হবে।’
রোববার সিওগ্যাট জানায়, এই পুনরায় খোলা কার্যক্রমটি একটি ‘প্রাথমিক পরীক্ষামূলক ধাপ’, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ‘ক্রসিংটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রাথমিক কাজ চলছে।’
তারা আরও জানায়, ‘এই প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই উভয় দিক থেকে বাসিন্দাদের প্রকৃত যাতায়াত শুরু হবে।’
ক্রসিং সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সোমবার আরও ব্যাপকভাবে ক্রসিংটি খোলার কথা রয়েছে।
তবে কতজন ফিলিস্তিনিকে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে দেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সূত্রগুলো জানায়, মিসর ‘ইসরাইল যাদের গাজা ছাড়ার অনুমতি দেবে, তাদের সবাইকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’
‘প্রতিটি দিন আমার জীবনশক্তি নিঃশেষ করে দিচ্ছে এবং আমার অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে,’ বলেন ৩৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ শামিয়া, যিনি কিডনি রোগে ভুগছেন এবং বিদেশে ডায়ালাইসিস চিকিৎসা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিটি মুহূর্তে রাফাহ স্থলবন্দর খোলার অপেক্ষায় আছি।’
বিদেশে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি পাওয়া ১৮ বছর বয়সী সাফা আল-হাওয়াজরিও অধীর আগ্রহে ক্রসিং খোলার অপেক্ষায় রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার স্বপ্ন পূরণের আশায় অপেক্ষা করছি, যা এই ক্রসিং খোলার সঙ্গে জড়িত। আশা করছি, এটি খুললেই দ্রুত ভ্রমণ করতে পারব।’
গাজার দক্ষিণ সীমান্তে মিসরের সঙ্গে অবস্থিত রাফাহ হলো একমাত্র স্থলবন্দর, যার মাধ্যমে ইসরাইলের ভেতর দিয়ে না গিয়ে গাজায় প্রবেশ বা গাজা থেকে বের হওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী ইসরাইলি বাহিনী তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনে সরে যাওয়ার পর রাফাহ এলাকা ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় ১০ অক্টোবর।
বর্তমানে গাজার অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আর বাকি অংশ হামাসের কর্তৃত্বে।
রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলার ফলে গাজার ২২ লাখ বাসিন্দার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির জন্য গঠিত ১৫ সদস্যের ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক সংস্থা—ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর সদস্যদের প্রবেশ সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় গঠিত এই কমিটির তত্ত্বাবধান করবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন কথিত ‘বোর্ড অব পিস’।
তবে এনসিএজির প্রধান ও সাবেক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের উপমন্ত্রী আলি শাথের নেতৃত্বাধীন কমিটি রোববার গাজায় প্রবেশ করবে না বলে জানিয়েছেন কমিটির এক সদস্য।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘কমিটির প্রধানকে জানানো হয়েছে যে, ইসরাইল সদস্যদের গাজায় প্রবেশের অনুমোদন দিয়েছে, তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যেন তারা ক্রসিংয়ের কার্যক্রম দ্রুততর করে এবং যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি করে।’