বাসস
  ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৫৯

অভিযানের ভয়ে মিনিয়াপোলিসে আত্মগোপনে অভিবাসী পরিবার

ঢাকা, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল কর্মকর্তাদের অভিবাসন বিরোধী অভিযানের কারণে দুই মাস ধরে ঘরবন্দি হয়ে আছেন আনা, কার্লোস ও তাদের ছেলে লুইস। নিজেদের বাড়ির দরজার ভেতরেই যেন বন্দী হয়ে পড়েছেন তারা।

মেক্সিকান এই পরিবারের বাড়িতে সারাদিন পর্দা টানা থাকে। দরজা ভেঙে ঢোকা ঠেকাতে ভেতর থেকে ধাতব দণ্ড দিয়ে ঠেস দিয়ে রাখা হয়।

মিনিয়াপোলিস থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়। 

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের এই শহরে বসবাস করছেন। গত মাসে এখানে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ তাদের আমেরিকান স্বপ্নকে পরিণত করেছে দুঃস্বপ্নে।

ছদ্মনাম ব্যবহার করে আনা এএফপিকে বলেন, ‘এভাবে বেঁচে থাকা অমানবিক। নিজের ঘরেই যেন একজন বন্দী।’ তার স্বামী ও ছেলেও একই কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।

৪৭ বছর বয়সী ওই মায়ের চার সন্তান। মেক্সিকোতে জন্ম হওয়ায় লুইস তার সঙ্গেই ঘরবন্দী থাকে। বাকি তিন সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নাগরিক। তবু তারা ঘর থেকে বের হলেই মায়ের বুক দুরুদুরু করে।

কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওরা নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও সম্মান পাবে কি না, সেই ভয় সব সময় থাকে। শুধু গায়ের রঙের কারণেই যেন ওদের তুলে নিয়ে যাওয়া না হয়।’

বাড়ি ফেরার আগে সন্তানদের অবশ্যই বার্তা পাঠাতে হয়। তা না হলে দরজায় কড়া নাড়লেও দরজা খোলা হয় না।
১৫ বছর বয়সী লুইস চায় ভাইুবোনদের মতো অবাধে যাতায়াত করতে। তার স্বপ্ন, ‘সব ঠিক হলে’ রাস্তার একেবারে কাছের ফাস্টফুডের দোকানে হেঁটে যাবে।

সে বলে, ‘এখন জায়গাটা চোখের সামনেই। কিন্তু তবু যেন অনেক দূরে।’

—‘ট্রাম্প আমাদের ঠকিয়েছেন—

অনলাইন ক্লাস শেষ হলে লুইস ডুবে থাকে ‘হাফ লাইফ’ নামের একটি ফার্স্ট পারসন শ্যুটার ভিডিও গেমে। অনেক সময় দিনে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত খেলায় মগ্ন থাকে সে।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন তার বাবা কার্লোস।

গ্রানাইটের রান্নাঘরের কাউন্টার বসানোর কাজ করেন তিনি। পরিবারের ভিসা আবেদনের আইনি প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় ১১ হাজার ডলার খরচ করেছেন। তবু প্রায় তিন বছর ধরে সেই প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।

তিনি ও আনা—দুজনেরই কাজের অনুমতিপত্র রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পাঠানো সশস্ত্র ও মুখোশধারী এজেন্টদের কাছে সেই কাগজের কোনো মূল্য নেই। গ্রেফতার বা বহিষ্কার ঠেকাতে এখন আর তা কোনো সুরক্ষা দেয় না।

কার্লোস প্রশ্ন করেন, ‘তারা কাজের অনুমতি দেয়। কিন্তু সেই অনুমতিপত্রে এই দেশে বৈধভাবে থাকার অধিকার নেই। এটা কীভাবে সম্ভব?’

৪৩ বছর বয়সী কার্লোস বলেন, ‘যখন বুঝলাম ট্রাম্প কাজের অনুমতির মাধ্যমে বহিষ্কার থেকে যে সুরক্ষা ছিল, তা তুলে দিয়েছেন, তখন মনে হয়েছে—তিনি আমাদের ঠকিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, আমরা এটা পাওয়ার যোগ্য। আমরা কোনো ভুল করিনি। আমরা অপরাধী নই।’

ট্রাম্পের কঠোর নীতির বাস্তবায়নে নিয়োজিত দুই ফেডারেল সংস্থা—ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) ও কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)— যে সামরিক ধাঁচের অভিযান চালাচ্ছে, তা ঘিরে দুর্ব্যবহারের আশঙ্কা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের বড় ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মিনিয়াপোলিস, লস অ্যাঞ্জেলেস ও শিকাগোতে মুখোশধারী এজেন্টদের দল রাজপথে তল্লাশি আরও জোরদার করেছে। বাসস্টপ ও হার্ডওয়্যার দোকানে কর্মজীবী মানুষদের লক্ষ্য করে এসব অভিযান চালানো হচ্ছে।

কার্লোস বলেন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তখন অভিযান ছিল বেশি লক্ষ্যভিত্তিক। সে কারণে নিজেকে এভাবে ঘরবন্দী করে রাখার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি।

— ‘মেট্রো সার্জ’ —

কার্লোস জানান, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তার পরিচিত দুজনকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘একজন মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। অন্যজন স্ত্রীকে নির্যাতন করত।’

মিনিয়াপোলিসে ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ চলতে থাকায় অভিযানে কতজন নির্দোষ মানুষ আটকা পড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসে গত গ্রীষ্মে অভিযানের সময় প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অভিযানে আটক অভিবাসীদের অর্ধেকেরও বেশি কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না।

কার্লোসের কাজ আর আনার রাঁধুনি বা ক্যাশিয়ার হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ মিলিয়ে সাধারণত দম্পতির মাসিক আয় ছিল প্রায় ছয় হাজার ডলার।

কিন্তু ডিসেম্বর থেকে তাদের কোনো আয় নেই।

অভিবাসন অভিযান ও সামরিক ধাঁচের অভিযানে অন্তর্ভুক্ত ‘মেট্রো সার্জ’‑এর নামে মিনিয়াপোলিসে চলমান কঠোর কার্যক্রমকে ঘিরে ইতোমধ্যেই সেখানে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব অভিযানে ফেডারেল এজেন্টরা নগরীর রাস্তায় অভিযান চালাচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

গত জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে এক বড় ঘটনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)‑এর একজন এজেন্ট রেনি নিকোল গুড নামে ৩৭ বছর বয়সী এক আমেরিকান নাগরিককে গুলি করে হত্যা করে বলে খবর আসে, যা স্থানীয়ভাবে তীব্র সমালোচনা ও গণআন্দোলন সৃষ্টি করেছে।

এরপর প্রতিদিনের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে ২৪ জানুয়ারিতে আরেকটি হত্যাকাণ্ডে ৩৭ বছর বয়সী ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)-এর নার্স অ্যালেক্স প্রেটটিকে ফেডারেল এজেন্টরা গুলি করে হত্যা করেছে। ঘটনাটি ব্যাপক বিতর্ক ও জনরোষ দেখা দিয়েছে।

এই ধরণের ঘটনার জন্য মিনিয়াপোলিসে স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক অধিকার সংগঠন  ও রাজনৈতিক নেতারা আইসিই‑এর ভূমিকা ও নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। অনেকেই দাবি করেছেন যে এসব অভিযান দরিদ্র ও নিরীহ সম্প্রদায়ের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করছে।

এদিকে, মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে মিনিয়াপোলিসে সব অভিবাসন কর্মকর্তাদের শরীরবাহী ক্যামেরা পরিধান করতে হবে, যা পরে দেশজুড়ে সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই সিদ্ধান্তটিও হত্যাকাণ্ড ও সমালোচনার পর আরেকটি পরিবর্তনের অংশ।